ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সংকট ২০২৭ সালের অনেকটা সময়জুড়েও অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি বছরের শেষ দিকে তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন বাড়লেও এ বছর তৈরি হওয়া ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফলে আগামী বছরের প্রথমার্ধেও ডিজেলের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ বজায় থাকার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক […]
ছবি: সংগৃহীত
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সংকট ২০২৭ সালের অনেকটা সময়জুড়েও অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি বছরের শেষ দিকে তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন বাড়লেও এ বছর তৈরি হওয়া ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফলে আগামী বছরের প্রথমার্ধেও ডিজেলের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ বজায় থাকার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আইইএর সতর্কতা অনুযায়ী, ডিজেলের উচ্চমূল্য পণ্য পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রকৃত আয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মূল্যস্ফীতির ওপর।
আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল ও গ্যাস অয়েলের সম্মিলিত নিট রপ্তানি দৈনিক ১৩ লাখ ব্যারেল কমেছে। এই ঘাটতি চলতি বছরের বৈশ্বিক ডিজেল ও গ্যাস অয়েলের চাহিদার প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশের সমান।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগারের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি থেকেও জ্বালানি সরবরাহ কমেছে।
এসব কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্ববাজারে ডিজেল ও গ্যাস অয়েলের সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সেপ্টেম্বরে অন্যান্য উৎস থেকে সরবরাহ বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে রপ্তানি কমে যাওয়ার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন দেশের মজুত থেকে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। সাধারণত বছরের এই সময়ে শীতকালীন চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে মজুত বাড়ার কথা। কিন্তু এবার উল্টো মজুত কমছে।
আইইএর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) দেশগুলোতে গ্যাস অয়েলের মজুত কমে ৫৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়। এটি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৫ শতাংশ কম। ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর ওই মজুত ছিল সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
অক্টোবরে উত্তর গোলার্ধে শীতকালীন জ্বালানির চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু শোধনাগারের কার্যক্রম সীমিত থাকায় মজুত আরও কমতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
আইইএর সতর্কতা, মজুতের নিরাপত্তাবলয় ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসান না হলে আগামী মাসগুলোতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পরিশোধন সক্ষমতায় বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে ডিজেলের দামে। আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে অপরিশোধিত তেলের দামের তুলনায় ডিজেল বিক্রি থেকে পাওয়া অতিরিক্ত মুনাফার ব্যবধান বা রিফাইনিং মার্জিন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলারে পৌঁছায়, যা রেকর্ড পর্যায়ের কাছাকাছি।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরে পাইকারি ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও দাম সর্বোচ্চ প্রায় ২২০ ডলারে পৌঁছেছিল। পরে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো সংকটের আগের পর্যায়ের তুলনায় অনেক বেশি।
ডিজেল সড়ক পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ, শিল্পকারখানা ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাই এ জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয়ই বাড়ে না, খাদ্য উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারজাত করার খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে তেল শোধনাগারগুলোর কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হতে পারে। এতে জ্বালানি উৎপাদন বাড়বে এবং মজুত পুনরায় পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে ডিজেল ও গ্যাস অয়েলের বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধি চলতি বছরে জমে ওঠা ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে না। ফলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধেও ডিজেল সরবরাহের ভারসাম্য নাজুক থাকবে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এই পূর্বাভাসের বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর। অঞ্চলটির শোধনাগারগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে না পারলে সরবরাহের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হতে পারে।
আইইএ বলছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাজারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে জ্বালানির চাহিদা আরও কমানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে এর জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব এবং বাড়তি ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
জ্বালানির ঘাটতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্যদেশগুলো মার্চে জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে একমত হয়। পরে এ কর্মসূচির আওতায় ঘোষিত পরিমাণ বাড়িয়ে ৪২ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল করা হয়।
আইইএর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ওই কর্মসূচির আওতায় ৩৩ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল মজুত থেকে ছাড়া হয়েছিল। তবে সেপ্টেম্বর মাসে মজুত থেকে তেল ছাড়ার গতি আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেক কমে আসে।
জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্দেশ্য হলো সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি মোকাবিলা এবং বাজারের ওপর চাপ কমানো। কিন্তু এ মজুত পরবর্তী সময়ে আবার পূরণ করতে হয়। ফলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সরবরাহ বিপর্যয়ের সময় দেশগুলোর হাতে থাকা সুরক্ষামূলক মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বরে বাড়লেও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি একই গতিতে বাড়েনি। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও ট্যাংকার চলাচলে নতুন করে হামলা পরিস্থিতির উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইইএ।
জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা দৈনিক গড়ে ২৬ লাখ ব্যারেল কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইইএ। এই পতনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী থাকবে ডিজেলের চাহিদা কমে যাওয়া।
সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৫৮ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে। তবে ২০২৭ সালে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। সে বছর বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ দৈনিক ৭৭ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
তবে সরবরাহ বাড়ার পূর্বাভাস থাকলেও ডিজেলের বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। চলতি বছরের ঘাটতি, কমে যাওয়া মজুত এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অনিশ্চয়তা বাজারে চাপ বজায় রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, আগামী বছর তেলের সামগ্রিক সরবরাহ বাড়লেও ডিজেলের সংকট কাটতে সময় লাগবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি স্বাভাবিক না হলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধজুড়ে সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) অক্টোবর ২০২৬ তেলবাজার প্রতিবেদন এবং রয়টার্স।