বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মা ও যমুনায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারিভাবে বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নদীতে চলমান ইলিশ শিকারের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েই চলছে। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়, হরিরামপুর ও দৌলতপুর উপজেলার প্রায় ৭০ কিলোমিটার নদীপথে ইলিশ শিকারিরা যেন এক মহোৎসবে মগ্ন, যেখানে প্রতিযোগিতার মতো চলছে কে বেশি ইলিশ ধরবে এবং […]
বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মা ও যমুনায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারিভাবে বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নদীতে চলমান ইলিশ শিকারের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েই চলছে। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়, হরিরামপুর ও দৌলতপুর উপজেলার প্রায় ৭০ কিলোমিটার নদীপথে ইলিশ শিকারিরা যেন এক মহোৎসবে মগ্ন, যেখানে প্রতিযোগিতার মতো চলছে কে বেশি ইলিশ ধরবে এবং বিক্রয় করবে।
মা ইলিশের রক্ষায় অভিযান ও শিকারিদের প্রতিযোগিতা
সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও শিকারিরা এতটাই সক্রিয় যে, প্রশাসনের অভিযান শুরু হওয়ার আগেই তাদের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে খবর পৌঁছে যায়। ফলে প্রশাসনের নৌকা নদীতে পৌঁছানোর সময় অনেক সময় শুধু ঢেউ দেখা যায়, শিকারিরা তখন নদী থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একই স্থানে আবার জাল ফেলা শুরু হয়।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ অসাধু এবং শিকারিদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের তথ্য শিকারিদের কাছে আগে থেকে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। এমনকি কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে শিকারি চক্রের গোপন আঁতাতের কথাও উঠেছে, যেখানে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে বড় পরিমাণ ইলিশ মাছ জেলা প্রশাসন ও ঢাকার বিভিন্ন অফিসারের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
সরকারি পরিসংখ্যান এবং অভিযানের ফলাফল
মৎস্য বিভাগ এবং শিবালয় উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে ২১ দিনে মোট ২৪০টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এই সময়ে ৭০টি মোবাইল কোর্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৭২ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা হিসেবে আদায় হয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এছাড়া এক কোটি ৮ লাখ মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস করা হয়েছে। অভিযানে জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৩ টন মা ইলিশ, যা superficially দেখে মনে হতে পারে যে অভিযান সফল হয়েছে।
জব্দকৃত ইলিশগুলো বিভিন্ন এতিমখানা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ। তবে বাস্তবে শিকারিরা কত ইলিশ নিধন করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
স্থানীয়দের অভিমত এবং বাস্তব চিত্র
নদীর চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, অবৈধ কারেন্ট জাল প্রকাশ্যে শুকানো হচ্ছে এবং নতুন জাল তৈরি হচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকাও মেরামত করা হচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় শিকারিরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের অভিযান কেবলমাত্র কাগজে এবং আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যেখানে বাস্তবে শিকার অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের নৌকা এসে যায়, কিন্তু নদীর বুকে অবৈধ জালের জঙ্গল স্থির থাকে।
ইলিশ সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জ এবং প্রভাব
মা ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ইলিশের উপর অবৈধ শিকার ও কারেন্ট জালের ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে ইলিশের প্রজনন ও টিকাউ বৃদ্ধিতে। ফলে, ইলিশের সংখ্যা কমে গিয়ে নদীর বাস্তুতন্ত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি ও যোগসাজশ দূর করতে হবে, এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করে আইনের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প জীবিকা ও অর্থনৈতিক সমাধান প্রদান করা প্রয়োজন, যা শিকারি চক্রকে অন্য পেশায় উদ্বুদ্ধ করবে।
এই ঘটনা আমাদের জানায় যে, শুধুমাত্র অভিযান চালিয়ে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন, যেখানে প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ, এনজিও এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা একসঙ্গে কাজ করবে। এই সমস্যা না সমাধান করলে ভবিষ্যতে ইলিশের সংকট বৃদ্ধি পাবে, যা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিকভাবে দেশের ক্ষতি করবে।