সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

প্রধান খবর
১২:৫১ অপরাহ্ন, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫০০ বছরের পুরোনো মানচিত্র বদলের উদ্যোগ জাতিসংঘের, নতুনভাবে দেখাবে বিশ্ব

বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ কার্টোগ্রাফিক প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। আরও ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। তবে জাতিসংঘের […]

৫০০ বছরের পুরোনো মানচিত্র বদলের উদ্যোগ জাতিসংঘের, নতুনভাবে দেখাবে বিশ্ব

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ কার্টোগ্রাফিক প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। আরও ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

তবে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তে পুরোনো মানচিত্র আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হচ্ছে না। বরং সদস্যদেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃথিবীর ভৌগোলিক আয়তন আরও সঠিকভাবে উপস্থাপন করে এমন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

কেন বদল আনার উদ্যোগ

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত মানচিত্রগুলোর একটি হলো ‘মারকেটর প্রজেকশন’। ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর ১৫৬৯ সালে সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এই মানচিত্র তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু গোলাকার পৃথিবীকে সমতল মানচিত্রে দেখানোর সময় এতে আয়তনের বড় ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। ফলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ডের আয়তন অতিরঞ্জিত মনে হয়, অন্যদিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা তুলনামূলক ছোট দেখায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রচলিত মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আকারের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ।

কী এই ‘ইকুয়াল আর্থ’?

২০১৮ সালে কার্টোগ্রাফার টম প্যাটারসন, বোয়ান সাভরিচ ও বার্নহার্ড জেনি ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন তৈরি করেন। এটি এমন একটি মানচিত্র পদ্ধতি, যেখানে মহাদেশগুলোর পারস্পরিক আয়তনের অনুপাতকে অনেক বেশি সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়।

নতুন প্রজেকশনে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য বিষুবীয় অঞ্চলকে প্রচলিত মারকেটর মানচিত্রের তুলনায় বড় দেখাবে। অন্যদিকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চল তুলনামূলক ছোট দেখাবে।

ভূগোলবিদদের মতে, কোনো সমতল মানচিত্রই পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে বিকৃতি ছাড়া পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না। তবে ‘ইকুয়াল আর্থ’ আয়তনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুল একটি ভারসাম্য তৈরি করে।

‘মানচিত্রও ধারণা তৈরি করে’

এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসি। জাতিসংঘে তিনি যুক্তি দেন, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্যের উপস্থাপন নয়; পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণা, শিক্ষা ও সামষ্টিক মানসিকতার ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।

তার মতে, কোনো অঞ্চলের আকার দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবতার তুলনায় ছোট বা বড় করে দেখানো হলে তা মানুষের মধ্যে সেই অঞ্চলের গুরুত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘের প্রস্তাবটিকে তাই শুধু মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নয়, বরং বিশ্বের ভৌগোলিক উপস্থাপনায় দীর্ঘদিনের বৈষম্য সংশোধনের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা

জাতিসংঘের এই উদ্যোগে একমাত্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভোটের আগে মার্কিন প্রতিনিধি প্রস্তাবটির সমালোচনা করে বলেন, জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় মনোযোগ দেওয়া উচিত; মানচিত্রের মতো বিষয়ে এমন উদ্যোগ সংস্থাটির মূল কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটিকে একটি ‘আদর্শিক’ প্রকল্প হিসেবেও সমালোচনা করা হয়েছে।

শুধু মানচিত্র নয়, বদলাতে পারে শিক্ষাতেও

জাতিসংঘের এই প্রস্তাবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে স্কুলের ভূগোল শিক্ষা, সরকারি মানচিত্র এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। টোগো ইতোমধ্যে বছরের শেষ নাগাদ তাদের স্কুলের ভূগোল শিক্ষাসামগ্রীতে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

তবে গুগল ম্যাপ বা নেভিগেশনের মতো সব ডিজিটাল ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থায় একইভাবে নতুন প্রজেকশন ব্যবহৃত হবে—এমন নয়। কারণ নৌ-চলাচলের ক্ষেত্রে মারকেটর প্রজেকশনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক সুবিধা এখনো রয়েছে।

প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বিশ্বকে দেখার প্রচলিত একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত মারকেটর মানচিত্রের বিকল্প হিসেবে ‘ইকুয়াল আর্থ’-এর প্রতি জাতিসংঘের এই সমর্থন তাই শুধু কার্টোগ্রাফির পরিবর্তন নয়; বিশ্বকে কীভাবে দেখা ও শেখানো হবে, সেই ধারণাতেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ