দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ কেমন হতে পারে, তা তুলে ধরেছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা। শুক্রবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ডা. তাসনিম জারা লিখেছেন, হাম খুবই সংক্রামক একটি রোগ। একজন […]
ছবি: সংগৃহীত
দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ কেমন হতে পারে, তা তুলে ধরেছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা।
শুক্রবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
ডা. তাসনিম জারা লিখেছেন, হাম খুবই সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, যা কোভিড বা ফ্লুর তুলনায় অনেক বেশি। হামের ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো ঘর থেকে বের হওয়ার দুই ঘণ্টা পরও সেখানে প্রবেশকারী অন্য কেউ আক্রান্ত হতে পারেন।
তিনি বলেন, এই কারণেই হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। এটিই ‘হার্ড ইমিউনিটি’র সীমা। এর নিচে নেমে গেলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, জাতীয়ভাবে টিকাদানের হার ৯০ বা ৯৫ শতাংশ হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈষম্য থেকে যায়। কোথাও হয়তো কভারেজ ৯৭ শতাংশ, আবার কোনো চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, বস্তি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তা ৬০ বা ৭০ শতাংশ হতে পারে। এই ফাঁকা জায়গাগুলোতেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হাম নিয়ন্ত্রণে করণীয় তুলে ধরে তাসনিম জারা বলেন, যেসব এলাকায় কেস পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। শুধু জেলা বা উপজেলা নয়, বরং ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম বা মহল্লাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ জরুরি।
তার মতে, দেশের প্রতিটি ঘরে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো বাস্তবসম্মত নয়। তাই একটি জাতীয় হাম হটলাইন বা কল সেন্টার চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে কেস শনাক্তকরণ, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড ও চিকিৎসা সমন্বয় করা সম্ভব।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামের লক্ষণ—জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং লাল র্যাশ—সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে। কেউ এসব উপসর্গ দেখলে নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করবেন।
কল সেন্টারে থাকা প্রশিক্ষিত চিকিৎসকেরা সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত করে নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাবেন, যাতে রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে নতুন সংক্রমণ না ছড়ান। একই সঙ্গে রোগীদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত ফলোআপও করা হবে।
তাসনিম জারা বলেন, প্রতিটি কল ভৌগোলিক তথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে বোঝা যাবে কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে এবং কোথায় দ্রুত টিকা টিম পাঠানো প্রয়োজন।
তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ১১১, ভারতের কোভিডকালীন হেল্পলাইন এবং পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা মোকাবিলায় একই ধরনের মডেল ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার, প্রতিবেশী, সহপাঠীসহ ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা সবাইকে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে।
তাসনিম জারা সতর্ক করে বলেন, হামের টিকা নেওয়ার পর শরীরে পূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে। তাই টিকার পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।
হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টিকে তিনি বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুরা জরুরি বিভাগ, করিডর বা ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষ করে টিকার বয়স হয়নি এমন শিশু, ক্যানসার রোগী বা গর্ভবতী নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
সমস্যা সমাধানে তিনি তিনটি প্রস্তাব দেন।
প্রথমত, প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট হাম চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যেখানে আলাদা আইসোলেশন কক্ষ ও যথাযথ ভেন্টিলেশন থাকবে।
দ্বিতীয়ত, একটি জাতীয় বেড-অ্যাভেইলেবিলিটি ড্যাশবোর্ড চালু করতে হবে, যাতে রিয়েল-টাইমে জানা যায় কোথায় কতটি বেড বা আইসিইউ খালি আছে।
তৃতীয়ত, শিশুদের আইসিইউ সংকট মোকাবিলায় প্রাইভেট হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় অত্যন্ত বেশি। অনেক পরিবার ধার-দেনা বা সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা করাচ্ছে। তাই হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় সরকারিভাবে বহনের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
সবশেষে তাসনিম জারা বলেন, বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কার্যকর কৌশল ইতোমধ্যে প্রমাণিত। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সমন্বয়। একই সঙ্গে কেন দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা খতিয়ে দেখতে সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানান তিনি।