মাসব্যাপী বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, বিপুল দর্শনার্থী সমাগম ও দেশি–বিদেশি উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) পূর্বাচলস্থ বাংলাদেশ–চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় দেশের সর্ববৃহৎ এই বাণিজ্য প্রদর্শনী। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। […]
ছবি: সংগৃহীত
মাসব্যাপী বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, বিপুল দর্শনার্থী সমাগম ও দেশি–বিদেশি উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) পূর্বাচলস্থ বাংলাদেশ–চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় দেশের সর্ববৃহৎ এই বাণিজ্য প্রদর্শনী।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আবদুর রহিম খান এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ।
চলতি আসরের মেলায় দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে মোট ৩২৯টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, হংকং ও মালয়েশিয়ার ১১টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করে।
মেলায় কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প খাতের পণ্য ও সেবার সমন্বিত প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটনির্ভর সামগ্রী, কৃষিজ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, কসমেটিক্স, গৃহসজ্জা, খেলনা, স্টেশনারিজ, হোম ডেকর, ক্রোকারিজ, হস্তশিল্প, প্লাস্টিক ও মেলামাইন সামগ্রী, হারবাল ও টয়লেট্রিজ, ইমিটেশন জুয়েলারি, রিয়েল এস্টেট খাতের পণ্য এবং ফাস্টফুডসহ নানা সেবামূলক কার্যক্রম মেলায় স্থান পায়।
এবারের মেলায় কয়েকটি নতুন ও উদ্ভাবনী পণ্য বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এর মধ্যে রয়েছে বাঁশের তৈরি ওয়ালটপ ও বাস্কেট, বহুমুখী পাটপণ্য, ড্রাই-ক্যান্ডি, কাপ্তাই লেকের রুই মাছের চিপস, হারবাল ও রোজেলা চা, অর্গানিক হেয়ার অয়েল, ভেজিটেবল ডাইংয়ের পোশাক, ঢাকাই মসলিন শাড়ি ও স্কার্ফ, পাটের ট্যাপেস্ট্রি, আর্টিফিশিয়াল ফুল এবং রেডি-টু-ইট বিরিয়ানি আইটেম।
আয়োজকদের তথ্যমতে, মেলার মাধ্যমে সম্ভাব্য রপ্তানি আদেশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২৪ কোটি টাকার সমান। বহুমুখী পাটপণ্য, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কসমেটিক্স, হাইজিন পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হ্যান্ডলুম, তৈজসপত্র, হোম টেক্সটাইল, নকশী কাঁথা ও ফেব্রিক্স খাতে এসব আদেশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও তুরস্কের ক্রেতাদের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
স্থানীয় বাজারেও উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। আয়োজকদের হিসাবে, রেস্তোঁরাসহ অভ্যন্তরীণ ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ আনুমানিক ৩৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা প্যাভিলিয়ন, স্টল ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। নির্মাণ কাঠামো, নান্দনিকতা, পণ্য উপস্থাপন, দর্শকসেবা, স্বাস্থ্যবিধি, ডিজিটাল কনটেন্ট, রপ্তানিতে অবদান ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিবেচনায় মোট ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
রপ্তানি পণ্য ও বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মেলার পাশাপাশি আটটি সেমিনার আয়োজন করা হয়, যেখানে সরকারি-বেসরকারি ট্রেড প্রমোশন সংস্থা, পণ্যভিত্তিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য প্রতিদিন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। যাতায়াত সুবিধায় বিআরটিসির ডেডিকেটেড বাস সার্ভিস ও কনসেশন রেটে পাঠাও সেবা চালু ছিল। অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ ও স্টল বরাদ্দ ব্যবস্থাও ছিল মেলার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
এ ছাড়া ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের স্মরণে স্থিরচিত্র প্রদর্শনী, এক্সপোর্ট এনক্লেভ, সিনিয়র সিটিজেন কর্নার, মা ও শিশু সেবা কেন্দ্র, শিশু পার্ক, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, সার্বিক আয়োজন, অংশগ্রহণ এবং বাণিজ্যিক ফলাফলের দিক থেকে এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা একটি সফল ও কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।