সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

বাণিজ্য
২:০৩ অপরাহ্ন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্কনীতিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাণিজ্যে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প ঘোষিত ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে সংবিধানবিরোধী ও আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করার পর পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের মোড় আসে। এই রায়ের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। […]

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্কনীতিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাণিজ্যে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প ঘোষিত ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে সংবিধানবিরোধী ও আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করার পর পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের মোড় আসে। এই রায়ের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য যেমন স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য নতুন উদ্বেগও তৈরি করেছে। কারণ আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্য একটি আইনের আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ফলে শুল্ক কমলেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

নতুন শুল্ক কাঠামো ও বাংলাদেশের অবস্থান

প্রাথমিক ঘোষণায় বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তা কমিয়ে এখন ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক মনে হলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট চাইলে ১৫০ দিনের জন্য সাময়িকভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারেন এবং এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।

এই পর্যালোচনায় শ্রমিকের অধিকার, কর্মপরিবেশ, মজুরি কাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশকে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হবে, অন্যথায় আরও কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

আদালতের রায়ে বদলে গেল হিসাব

২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এতে বাংলাদেশসহ বহু দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধাক্কার আশঙ্কা দেখা দেয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার।

এরপর দরকষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায়, যেখানে পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য ও বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। তবে এই চুক্তিকে শুরু থেকেই ‘অসম ও চাপিয়ে দেওয়া’ বলে আখ্যা দেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

সাম্প্রতিক রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জানায়, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যে আইনের মাধ্যমে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, তা মূলত অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে আগের শুল্ক কাঠামো কার্যত বাতিল হয়ে যায়।

ট্রাম্পের ‘প্ল্যান বি’ এবং নতুন উদ্বেগ

আদালতের রায়ের পরপরই ট্রাম্প নতুন আইনের আওতায় ১০ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপ করেন। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলো বাতিল হচ্ছে না, তবে চুক্তির শর্তগুলো বহাল থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত। অর্থাৎ, শুল্ক কমানো হলেও বাণিজ্য আলোচনায় চাপ বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি হলেও আমদানি তুলনামূলক কম। এই বাণিজ্য ঘাটতিই ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল।

নতুন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখনই নতুন করে দরকষাকষিতে না গিয়ে সময় নেওয়া উচিত। কারণ দ্রুত আলোচনায় গেলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির হলেও এখনই আলোচনায় যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বরং ১৫০ দিনের সময়কে কাজে লাগিয়ে শ্রমিক অধিকার, কারখানার নিরাপত্তা, পরিবেশগত মান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা জোরদার করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

তিনি আরও বলেন, এত অল্প সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সব দেশের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্পন্ন করা কঠিন। তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের মূল নজর থাকবে চীন ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিগুলোর দিকে।

ব্যবসায়ীদের শঙ্কা

তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শুল্কনীতির এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও রপ্তানি পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক চুক্তি ছিল কঠিন ও অসম, যেখানে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকার লাভ বেশি।

তিনি বলেন, “এখন ১০ শতাংশ শুল্ক কমেছে, কিন্তু কতদিন এটি থাকবে—তা কেউ জানে না। ফলে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।”

সামনের চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামনে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে শ্রম ও পরিবেশ মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাণিজ্য কূটনীতিতে দক্ষতা বৃদ্ধি। কারণ ভবিষ্যতে যেকোনো মূল্যায়নে এসব বিষয়ই মূল ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য আপাত স্বস্তির হলেও দীর্ঘমেয়াদে সতর্ক ও কৌশলী প্রস্তুতির বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ