যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের পরাজয়কে নিজেদের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে ইরানের কট্টরপন্থী মহল। তাদের দাবি, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে ওয়াশিংটনকে আরও বড় ছাড় দিতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ অব্যাহত রেখে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বাড়ানোর কথাও বলছেন দেশটির রক্ষণশীল রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা নিয়ে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের পরাজয়কে নিজেদের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে ইরানের কট্টরপন্থী মহল। তাদের দাবি, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে ওয়াশিংটনকে আরও বড় ছাড় দিতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ অব্যাহত রেখে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বাড়ানোর কথাও বলছেন দেশটির রক্ষণশীল রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা নিয়ে ইরানের কট্টরপন্থীদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। বুধবার এক বার্তায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ‘সামান্যতম আত্মসমর্পণের প্রবণতা’ থেকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ইরানের কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় থাকা প্রতিনিধিদের উদ্দেশেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজের সঙ্গে এক ফোনালাপে স্বীকার করেছেন, ইরানের যুদ্ধ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের অন্যতম কারণ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, যুদ্ধের কারণেই তাঁরা নির্বাচনে হেরেছেন।
ট্রাম্প ও ভ্যান্সের বক্তব্যকে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে ইরানের কট্টরপন্থীরা। দেশটির রক্ষণশীল রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমগুলো মার্কিন নির্বাচনের ফলকে ইরানের জন্য রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে বর্ণনা করছে।
ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম রাজা নিউজের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে না দেওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে সংকট থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তাড়াহুড়ো করে কোনো চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পকে দায় এড়ানোর সুযোগ না দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানো, দেশটির কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হতে বাধ্য করা এবং জ্বালানির দাম বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।
সংঘাতের আট মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ এখন অনেকটা অচলাবস্থায় রয়েছে। সামরিক তৎপরতা কমেছে, কিন্তু কূটনৈতিক আলোচনাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের আলোচকেরা তেহরান ও দোহার মধ্যে যাতায়াত করছেন। কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মতপার্থক্য কমিয়ে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করা সম্ভব হয়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি সিএনএনকে বলেন, সাম্প্রতিক মার্কিন নির্বাচনের ফলকে ইরানের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের কৌশলের সাফল্য হিসেবে দেখছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্ত নিয়ে তেহরানের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে।
আজিজির মতে, ট্রাম্পের পক্ষে শুধু ‘মিশন সম্পন্ন’ ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শেষ করা সহজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমালোচনা মোকাবিলা করতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় আদায় করতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে শক্ত অবস্থান থেকে যুদ্ধ শেষ করার দাবি তোলার পথ বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের ফলের পর ইরানের কাছে পারমাণবিক বিষয়ে ট্রাম্পকে ছাড় দেওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। বরং যেকোনো চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে—এমন অবস্থানে আরও অনড় হতে পারে তেহরান।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা। তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি এখনো রয়েছে।
অক্টোবরে ট্রাম্প বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। তবে নির্বাচনের পর আবার হামলা শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়। পাল্টা হামলার পরিধি বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছিল ইরান।
গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেশম দ্বীপে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতেও সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। তবে দুই পক্ষই এসব হামলার তীব্রতা কম করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চলমান আলোচনা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এমন অবস্থান নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা আরও এগোবে কি না। তিনি বলেন, সম্ভব হলে ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করতে চান না, তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁকে হয়তো তা করতে হতে পারে। এ বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নির্বাচনের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। শুক্রবার কাতার জানায়, উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনার জন্য ট্রাম্প দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোন করেছিলেন।
এর আগের দিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, জর্ডান, তুরস্ক, সাইপ্রাস ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন।
ইরানের কট্টরপন্থীদের একাংশ প্রকাশ্যে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির নেতৃত্ব এমন একটি সমঝোতা চায়, যার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিনা তুসি সিএনএনকে বলেন, ইরান এমন অবস্থানে যুদ্ধ শেষ করতে চায়, যাতে দেশটির প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক প্রভাব বজায় থাকে। একই সঙ্গে এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে একঘরে করা, ক্রমাগত চাপ দেওয়া কিংবা হামলার ঝুঁকিতে ফেলার সুযোগ না পায়।
ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাতটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ক্ষতিপূরণ, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। ওয়াশিংটন এসব দাবি মেনে নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপে পড়েছে এবং দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
যুদ্ধ অচলাবস্থায় পৌঁছানোর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। এতে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
সিনা তুসির মতে, ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হলেও দেশটির নেতৃত্ব মনে করছে, সংঘাতের মধ্য দিয়ে অর্জিত দর-কষাকষির সুযোগগুলো স্থায়ী সুবিধা আদায় না করে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে দেশটির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত রাখার পক্ষে। অন্যদিকে মধ্যপন্থীদের একটি অংশ মনে করে, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ালে অর্থনৈতিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে ইরানের নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বজায় রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ। সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে ইরান স্বল্পমেয়াদি কৌশল হিসেবে অঞ্চলের তেল স্থাপনায় হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের লক্ষ্য শুধু যুদ্ধের অবসান নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো। সিনা তুসির মতে, ইরান চায় প্রতিবেশী দেশগুলো বুঝুক, তাদের নিরাপত্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ইরানের স্বার্থকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বুধবার দেওয়া বার্তায় মোজতবা খামেনি যুদ্ধকে ‘উজ্জ্বল ও আশাব্যঞ্জক ভোরের’ সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, এই যুদ্ধ একটি ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থার’ ভিত্তি তৈরি করছে।
তবে ইরানের এই লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সংঘাতে জড়াতে পারে। নির্বাচনী পরাজয়ের পর ট্রাম্প দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: সিএনএন