সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

প্রধান খবর
৪:০০ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি প্রচারে যুদ্ধের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক রিপাবলিকান প্রার্থীদের কেউ কেউ যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও দ্রুত সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানাচ্ছেন। […]

ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ মিনিটে পড়ুন |

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি প্রচারে যুদ্ধের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক রিপাবলিকান প্রার্থীদের কেউ কেউ যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও দ্রুত সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানাচ্ছেন।

মিশিগানে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ ও তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের মধ্যে প্রথম বিতর্কের প্রশ্ন ছিল অর্থনীতি নিয়ে। তবে দুই প্রার্থীর মতপার্থক্যের কেন্দ্রে উঠে আসে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ।

বুধবারের বিতর্কে আল-সায়েদ বলেন, গ্যাসের দাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাসের দাম, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সবকিছুর পেছনেই আসলে ইরানের এই যুদ্ধ দায়ী। আমাদের এখন একটি ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন বা যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা প্রয়োজন।’

ট্রাম্পের সমর্থক কোনো সিনেটর যেন এ যুদ্ধে প্রেসিডেন্টের পাশে না দাঁড়ান, সে আহ্বানও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার আইনি উদ্যোগের প্রসঙ্গ উঠে আসে।

মিশিগানজুড়ে ডেমোক্র্যাটরা জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে যুদ্ধের বিরোধিতাকে নির্বাচনি প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন।

ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (আইজিএ) প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জোনাথন গায়ার বলেন, ইরান যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর দৈনন্দিন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, ভোটাররা সাধারণত পররাষ্ট্রনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলেও যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে পররাষ্ট্রনীতিই এখন অর্থনীতির ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

আইজিএর গত মাসে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের ৬০ শতাংশ যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা ও পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সমীক্ষায় ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা একমত হয়েছেন যে, এ সংঘাতের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি

২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হতে থাকে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটিতে ভারী যন্ত্রপাতি চালানো এবং সারা দেশে পণ্য পরিবহনে ট্রাকের জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

পেট্রোলের দাম বাড়ার প্রভাবও সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৩ ডলারের কম ছিল। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) তা বেড়ে ৪ দশমিক ২৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন এক সময়ে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্ন সামনে এসেছে, যখন জীবনযাত্রার ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু।

ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা দাবি করে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতেই যুদ্ধটি প্রয়োজনীয় ছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে মার্কিন হামলার মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে—এমন কোনো প্রমাণ তাঁদের কাছে নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে রিপাবলিকানদের অবস্থান

মিশিগানের সিনেট বিতর্কে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রতি গ্যালন গ্যাসে ৮ ডলার দিতে চান, তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করতে দিন। তাহলে পুরো অঞ্চলের ওপর থেকে আপনাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে।’

তবে যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও সংঘাত দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন রজার্স। সম্প্রতি একটি মুদি দোকানে ধারণ করা নির্বাচনি বিজ্ঞাপনে তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়া দরকার এবং তা দ্রুত শেষ হওয়া উচিত।’

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে লড়াই করা অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের বক্তব্যেও একই ধরনের অবস্থান দেখা গেছে।

প্রতিবেশী ওহাইও অঙ্গরাজ্যে সিনেটর জন হাস্টেড যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। আইওয়ায় সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কংগ্রেসওম্যান অ্যাশলি হিনসন জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পকে সংঘাতের তাৎক্ষণিক ও সফল সমাপ্তি টানার আহ্বান জানিয়েছেন। মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স একাধিক ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।

এদিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী মাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে আবারও সর্বাত্মক লড়াই শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন।

বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি এটি আমাদের করা সেরা কাজগুলোর একটি। আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার থেকে আটকে দিয়েছি। এটি আমাদের অন্যতম সেরা কাজ এবং এটি করতে প্রচুর সাহসের প্রয়োজন ছিল, কারণ অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট এটি করতে ইচ্ছুক ছিলেন না।’

যুদ্ধের প্রতি সমর্থনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

যুদ্ধটি সামগ্রিকভাবে অজনপ্রিয় হলেও রিপাবলিকানদের বড় একটি অংশ এখনো এর প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছেন।

চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান উত্তরদাতা যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তবে আইজিএর সমীক্ষায় রিপাবলিকানদের সমর্থনের তীব্রতা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংস্থাটির আগস্ট মাসের সমীক্ষায় যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি রিপাবলিকানদের সমর্থন ছিল ৭৪ শতাংশ। এপ্রিলে এ হার ছিল ৪০ শতাংশ, আর আগস্টের সমীক্ষায় মাত্র ৩৪ শতাংশ রিপাবলিকান উত্তরদাতা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানান।

জোনাথন গায়ারের মতে, রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি জোরালো সমর্থন কমে আসা নির্বাচনে দলটির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তবে তাঁর প্রতি সমর্থনের তীব্রতা কমেছে। ভোটাররা যদি ভোট দিতে আসেন এবং নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তাহলে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনি প্রচারে যুদ্ধের প্রভাব

নির্বাচনের দুই সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরছেন। দেশজুড়ে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীদের চাপে ফেলতে তাঁরা ধারাবাহিকভাবে সংঘাতের প্রসঙ্গ সামনে আনছেন।

বুধবার ডেট্রয়েটে আল-সায়েদের সমর্থকদের উপস্থিতিতে আয়োজিত সিনেট বিতর্ক প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফির কাছে যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে ফেরা মারফির বক্তব্যে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিই বেশি গুরুত্ব পায়।

মারফি আলজাজিরাকে বলেন, ডেট্রয়েটে ডিজেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধ আবার শুরু হলে তা আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘মাইক রজার্স বিতর্কে বললেন যে, তিনি যুদ্ধকে সমর্থন করবেন, যা মূলত আমেরিকান অর্থনীতির জন্য একপ্রকার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সামিল।’

মিশিগানের ভোটারদের সামনে বড় সিদ্ধান্ত রয়েছে উল্লেখ করে মারফি বলেন, ‘আপনি যদি চান এই যুদ্ধ আরও এক বছর ধরে চলুক, আপনি যদি গ্যাসের দাম গ্যালনপ্রতি ৮ ডলারে উঠুক তা চান, তবে মাইক রজার্সকে ভোট দিন। আর আপনি যদি যুদ্ধ বন্ধ করতে চান, পণ্যের দাম কমাতে চান, তবে আব্দুল আল-সায়েদকে ভোট দিন।’

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি রাজনীতিতে এখন দুটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে এবং এর অর্থনৈতিক মূল্য কতটা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হতে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা (বিশ্লেষণ)।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ