কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইউক্রেনের আকস্মিক হামলার পর বিশ্বরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইউরোপের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন একই সূত্রে গেঁথে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন পরোক্ষ ছায়াযুদ্ধ চললেও কাস্পিয়ান সাগরের এই ঘটনা ইরান ও ইউক্রেনকে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় […]
ছবি: সংগৃহীত
কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইউক্রেনের আকস্মিক হামলার পর বিশ্বরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইউরোপের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন একই সূত্রে গেঁথে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন পরোক্ষ ছায়াযুদ্ধ চললেও কাস্পিয়ান সাগরের এই ঘটনা ইরান ও ইউক্রেনকে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
গত ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে ভাসমান একটি ইরানি জাহাজে সামরিক অভিযান চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। কিয়েভের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি ইরান থেকে রাশিয়ায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে তেহরান কড়া ভাষায় এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ হিসেবে দাবি করেছে। ইউক্রেনীয় এই হামলায় জাহাজের এক নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একে জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জড়িয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের প্ররোচনায় ইউক্রেন এই হামলা চালিয়েছে। ঘটনার কড়া জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে তেহরান।
অন্যদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইরানের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে বলেন, রাশিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসা ইরান এখন আর নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইউক্রেন সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয় ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর। সে সময় থেকে রুশ বাহিনী ইরানের তৈরি ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়। শুধু তা-ই নয়, ইরান রাশিয়াকে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রশিক্ষক দিয়ে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরানি ড্রোনের আক্রমণের মুখে ইউক্রেন দ্রুত নিজস্ব প্রতিরোধ প্রযুক্তি গড়ে তোলে। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত তীব্র রূপ নিলে, ইউক্রেন উপসাগরীয় অঞ্চল ও মার্কিন বাহিনীকে সেই অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করার প্রস্তাব দেয়। কিয়েভের ২০০ জনের বেশি সামরিক বিশেষজ্ঞ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ড্রোন প্রতিরোধে কাজ করছেন এবং সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছেন।
অন্যদিকে কিয়েভের দাবি, রাশিয়াও বদলে ইরানকে কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারি চালাতে রাশিয়া ইরানকে মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে।
কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে দুই দেশের চলমান পরোক্ষ লড়াই এখন খোলাখুলি রূপ নিল। রাশিয়া ও ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক আঁতাত, ইউক্রেনের পাল্টা আঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত—সব মিলিয়ে দুটি ভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ এখন একক ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।