চলচ্চিত্র তারকা সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর ঘটনাটি নিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও এক সময়ের চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরোনো তদন্তের নথি, জবানবন্দি, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। এসব তথ্য নতুন করে যাচাই করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। […]
ছবি: সংগৃহীত
চলচ্চিত্র তারকা সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর ঘটনাটি নিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও এক সময়ের চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরোনো তদন্তের নথি, জবানবন্দি, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। এসব তথ্য নতুন করে যাচাই করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গত রোববার সৌদি আরবে যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাকে আটক করা হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে সালমান শাহর বাসায় কী ঘটেছিল, সেদিন সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছিল—এসব বিষয় নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ১৯৯৭ সালের একটি মামলায় রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই জবানবন্দিতে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা, কয়েকজনের সম্পৃক্ততা এবং অর্থ লেনদেনের বিষয় উঠে এসেছিল।
সিআইডি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ওই জবানবন্দিতে সালমানের স্ত্রী সামিরা হকের সঙ্গে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পর্কের জেরে হত্যার পরিকল্পনা এবং ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তির কথা উল্লেখ ছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে।
তবে রিজভী আহমেদ সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। সালমান ও অভিনেত্রী শাবনূরকে ঘিরেও তিনি নানা বক্তব্য দিয়েছেন। এসব বক্তব্যের কিছু অংশ পরস্পরবিরোধী বলে অভিযোগ করেছেন শাবনূর। ফলে প্রায় ৩০ বছর আগের জবানবন্দি এবং সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা নয়, হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার দিন তার স্ত্রী সামিরা হক পরিবারের সদস্যদের বাসায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিলেন কি না, পরে কীভাবে সালমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং পরিবারের পক্ষ থেকে করা অন্যান্য অভিযোগের সত্যতা কী—এসব বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, রাতে প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছ থেকে খবর পেয়ে তারা বাসায় গিয়ে সালমানের মরদেহ দেখতে পান। তার ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা কমর উদ্দিন আহমদ প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরে পরিবার হত্যার অভিযোগ তোলে।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে দেওয়া প্রতিবেদনে সালমানের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়। পরিবার ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০১৬ সালে মামলার তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে তার পরিবার ওই প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এর পরদিন রমনা থানায় ১১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।
ডনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এ মামলার তদন্তে নতুন করে গতি এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে পুনরায় সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের বিষয়টিও তদন্তের আলোচনায় রয়েছে। সিআইডির পক্ষ থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের আবেদন করা হয়েছিল এবং আদালত তা অনুমোদনও দিয়েছিলেন।
পরে বাদীপক্ষের আবেদনের পর ওই আদেশ বাতিলের বিষয়ে আদালতে প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় ৩০ বছর পর দেহাবশেষ থেকে কার্যকর আলামত পাওয়ার সম্ভাবনা, ধর্মীয় বিষয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বাদীপক্ষ আপত্তি জানিয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ডনের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোনো নথি ও সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে—
এ ছাড়া ওই সময়ের সাক্ষীদের বক্তব্য এবং পুরোনো তদন্তে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের মিল-অমিলও যাচাই করা হতে পারে।
ডনের গ্রেপ্তারে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেই তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। তার দাবি, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তিনি সামিরা হক, লতিফা হক লুসিসহ মামলার পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারেরও দাবি জানিয়েছেন।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, ডনের গ্রেপ্তার মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। প্রয়োজন হলে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আইনানুগ সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এরই মধ্যে আটবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই আদালত আগামী ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন নির্ধারণ করেন।
ডনের গ্রেপ্তারের পর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভক্তদের অনেকে দ্রুত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে রিজভী আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক চলছে। ফলে দীর্ঘ ৩০ বছর পর সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে নতুন করে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর উত্তর এখন সিআইডির তদন্তের দিকেই তাকিয়ে আছে।