সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

বাণিজ্য
৩:৩২ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি, ভারত থেকে বাড়ছে আমদানি

একসময় বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ ছিল বাংলাদেশ। তবে দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রতিবেশী ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে ১৯টি নিবন্ধিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে তিন লাখ […]

বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি, ভারত থেকে বাড়ছে আমদানি

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

একসময় বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ ছিল বাংলাদেশ। তবে দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রতিবেশী ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে ১৯টি নিবন্ধিত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে তিন লাখ কেজি বা ৩৫০ টনের বেশি ইলিশ আমদানি করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশীয় বাজারে ইলিশের সংকট এবং আকাশছোঁয়া দামের পাশাপাশি ভারতীয় ইলিশ তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাওয়ায় আমদানির প্রতি তাঁদের আগ্রহ বেড়েছে।

দেশীয় উৎপাদন কমার পেছনে নানা কারণ

সংশ্লিষ্ট সূত্র, কাস্টমস কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, নদী দূষণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন, কারেন্ট জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন এবং সমুদ্রে অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকারের কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

এর ফলে দেশীয় বাজারে ভালো মানের ইলিশের সরবরাহ কমেছে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে গুজরাটের ভারুচ ও নর্মদা নদীর মোহনা অঞ্চলে এবার তুলনামূলক বেশি ইলিশ ধরা পড়েছে। এতে সেখানে মাছের সরবরাহ বেড়েছে এবং দামও কমেছে।

পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। এর বড় অংশই এসেছে গুজরাট থেকে।

গুজরাটের ইলিশ বড় আকারের এবং প্রচুর ডিমযুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশি বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। কম দামে সংগ্রহ করে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে এনে বিক্রি করায় ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কারণ দেশে ইলিশ আমদানির ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ এবং প্রজননের সময় নদীতে আসে। সমুদ্র থেকে ভারতীয় জেলেরা মাছ ধরে ফেলায় বাংলাদেশের ইলিশের মজুত কমে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় অংশ বাংলাদেশে হলেও এ মাছের জন্য ভারতীয় সরবরাহের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ ও উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইলিশ গবেষকদের মতে, মাছের চলাচলের পথ বা মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জলদূষণের কারণেও উৎপাদন কমছে। ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে গত সরকারের সময়ে নেওয়া চার শত কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

খালেদ কনক বলেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নেওয়া প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হয়েছে বা কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেন ইলিশের উৎপাদন কমছে, সেটিও বের করতে হবে।

উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে

কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তাদের দেওয়া ধারণা অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনেরও কম হতে পারে।

অন্যদিকে, গত অর্থবছরে ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ১ হাজার ২০০ টন রপ্তানির লক্ষ্য থাকলেও ১১০ টনের কম ইলিশ রপ্তানি করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

গুজরাটে ইলিশের বিপুল জোগান

পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানিকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানিয়েছেন, এ বছর গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন বেশি হওয়ায় সেখানে উদ্বৃত্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে এবং দামও কমেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বড় আকারের ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বেশি। গুজরাটের ইলিশ বড় ও ডিমে ভরা হওয়ায় বাংলাদেশি বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে ইলিশের ডিম প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে রপ্তানিও করা হয় বলে জানান তিনি।

মাকসুদের মতে, বর্তমানে এই বাণিজ্যিক সরবরাহপথ গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ভারুচের ভাদভূত এলাকার মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেল বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে।

তিনি জানান, ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি সরাসরি বাংলাদেশেও ইলিশ পাঠানো হয়। বড় চালান সাধারণত রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে এবং কম পরিমাণ হলে ট্রেনের কনটেইনারে পাঠানো হয়।

তাঁর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ভারুচ থেকে প্রায় তিনটি ট্রাক ছাড়ে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ২৫০টি বাক্স থাকে এবং প্রতিটি বাক্সে প্রায় ৬০ কেজি ইলিশ থাকে।

হাওড়ার কালীবাবুর বাজার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রথীকান্ত বার বলেন, এ বছর বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও পশ্চিমবঙ্গের বাজারে এসে ছোট পরিমাণে, প্রায় দেড় থেকে ৩ মেট্রিক টন করে ইলিশ কিনছেন। তাঁদের চাহিদার বড় অংশই গুজরাট ও মহারাষ্ট্র থেকে আসা বড় আকারের ইলিশ।

বাজারে ইলিশের সংকট ও চড়া দাম

ঢাকার বাজারে গত কয়েক সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাছ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ৭০০ গ্রামের ইলিশের দামও প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা বা তার কাছাকাছি।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। আর বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় অংশ বাংলাদেশে হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল উৎপাদন সক্ষমতার দেশকে ইলিশের জন্য আমদানিনির্ভর হয়ে পড়া ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। ইলিশের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ, অবৈধ জাল বন্ধ এবং মাছের চলাচলের পথ ও জলজ পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ