ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের হানিফ মিয়ার সংসারে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল নানা টানাপোড়েন। বাবার সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন, বসতভিটার জমি নিয়ে পারিবারিক জটিলতা এবং আর্থিক সংকট—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছিলেন তিনি। এর মধ্যেই ৪০ টাকা খরচ করে কিনেছিলেন দুটি লটারির টিকিট। তবে সংসারের প্রতিটি টাকা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ৪০ টাকা দিয়ে লটারির টিকিট কেনায় স্বামীকে বকেছিলেন স্ত্রী […]
ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের হানিফ মিয়ার সংসারে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল নানা টানাপোড়েন। বাবার সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন, বসতভিটার জমি নিয়ে পারিবারিক জটিলতা এবং আর্থিক সংকট—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছিলেন তিনি। এর মধ্যেই ৪০ টাকা খরচ করে কিনেছিলেন দুটি লটারির টিকিট। তবে সংসারের প্রতিটি টাকা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ৪০ টাকা দিয়ে লটারির টিকিট কেনায় স্বামীকে বকেছিলেন স্ত্রী নীলা আক্তার।
কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই টিকিটই যেন তাদের সামনে নতুন আশার দরজা খুলে দিয়েছে। দুটি টিকিটের একটি নম্বর প্রথম পুরস্কারের নম্বরের সঙ্গে মিলে গেছে বলে দাবি করেছেন হানিফ। তবে চূড়ান্ত যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের বাসিন্দা হানিফ মিয়া (৩১) দাবি করছেন, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) আয়োজিত সরকার অনুমোদিত ‘বিপিকেএস জাতীয় লটারি-২০২৬’-এর ৩০ লাখ টাকার প্রথম পুরস্কারের নম্বর তার কেনা একটি টিকিটের সঙ্গে মিলে গেছে।
হানিফের জীবন কখনোই খুব সহজ ছিল না। স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে চাকরির পাশাপাশি হাঁসের খামার ও কৃষিকাজ করে সংসার চালান তিনি। পারিবারিক সংকটও দীর্ঘদিন ধরে তাকে তাড়া করে ফিরছে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়ার পর মা হামিদা বেগমকে নিয়ে নানা বাড়িতেই বড় হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি বসতভিটার জমি নিয়েও পারিবারিক জটিলতায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
এর মধ্যেই স্থানীয় বাজারে লটারির টিকিট বিক্রির খবর পান হানিফ। কৌতূহল ও ভাগ্য পরীক্ষা—দুই কারণেই ২০ টাকা করে দুটি টিকিট কেনেন তিনি। পরে অনলাইনে লটারির ফল দেখতে গিয়ে একটি নম্বরে তার চোখ আটকে যায়। নিজের টিকিটের নম্বরের সঙ্গে প্রথম পুরস্কারের নম্বরটি হুবহু মিলে গেছে বলে দেখতে পান তিনি।
হানিফ জানান, এরপর টিকিট নিয়ে বিপিকেএস কার্যালয়ে যান। সেখানে কর্মকর্তারা টিকিটটি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করেন। তবে আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাকে।
স্বামীর সেই ৪০ টাকা খরচের বিষয়টি এখনো মনে আছে নীলা আক্তারের। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, এ টাকা দিয়ে বাজার থেকে সবজি আনলেও সংসারের কাজে লাগত। পরে একদিন নামাজ পড়ে এসে হানিফ বলল, অনলাইনে লটারির ফল মিলিয়ে দেখতে। নম্বর মেলানোর পর দেখি প্রথম পুরস্কারের নম্বরের সঙ্গে আমাদের টিকিট মিলে গেছে। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কয়েকবার মিলিয়ে দেখার পরও মনে হচ্ছিল, যেন স্বপ্ন দেখছি।’
নীলা বলেন, ‘যদি সত্যিই পুরস্কারের টাকা পাই, তাহলে আমাদের সংসারে অনেক স্বস্তি ফিরবে।’
হানিফও এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তার পরিকল্পনা, পুরস্কারের অর্থ হাতে পেলে নিজের একটি ফার্মেসি গড়ে তোলা, হাঁসের খামার বড় করা এবং পরিবারের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করা।
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির জাতীয় লটারি প্রকল্পের পরিচালক হাজী মো. আলম কবির বলেন, প্রথম পুরস্কারের দাবিদার হিসেবে এখন পর্যন্ত হানিফ মিয়াই মূল টিকিট নিয়ে কার্যালয়ে এসেছেন। টিকিটটি প্রাথমিকভাবে সঠিক মনে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সবকিছু যাচাই করবে।
তিনি জানান, চলতি মাসের ২০ তারিখের পর যাচাই-বাছাই শুরু হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হবে।
এখন হানিফের পরিবারের দিন কাটছে এক অদ্ভুত অপেক্ষায়। কাগজের ছোট্ট একটি টিকিট সত্যিই তাদের জীবনে নতুন অধ্যায় খুলে দেবে, নাকি সবকিছু শেষ পর্যন্ত থেকে যাবে এক মুহূর্তের স্বপ্ন হয়ে—তার উত্তর মিলবে আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর।