হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ১৩তম দিনে গড়িয়েছে নেপালের উদ্ধার অভিযান। কোথাও ধ্বংসস্তূপ, কোথাও কাদার স্তর, আবার কোথাও গভীর টানেলের ভেতরে আটকে থাকার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে উদ্ধারকারীদের সামনে তৈরি হয়েছে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি। অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত টানেল উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্সও বলছেন, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি। তার […]
ছবি: সংগৃহীত
হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ১৩তম দিনে গড়িয়েছে নেপালের উদ্ধার অভিযান। কোথাও ধ্বংসস্তূপ, কোথাও কাদার স্তর, আবার কোথাও গভীর টানেলের ভেতরে আটকে থাকার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে উদ্ধারকারীদের সামনে তৈরি হয়েছে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি।
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত টানেল উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্সও বলছেন, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি। তার মতে, এটি একটি মাত্র উদ্ধার অভিযান নয়; একই সময়ে কয়েকটি স্থানে সম্ভাব্য জীবিত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ও পাহাড় ধসের পর নেমে আসে ভয়াবহ বন্যা। ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিভিন্ন অবকাঠামো ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এসব প্রকল্পের একাধিক টানেলের ভেতরে শ্রমিকেরা আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপুলসংখ্যক কর্মী রয়েছেন। ফলে উদ্ধারকারীদের এখন পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংসস্তূপ এবং ভূগর্ভস্থ টানেল—তিন জায়গাতেই একসঙ্গে অনুসন্ধান চালাতে হচ্ছে।
ডিক্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, প্রতিটি উদ্ধারস্থলের ঝুঁকি ও পরিস্থিতি আলাদা। কোথাও ধসের আশঙ্কা, কোথাও পানির প্রবাহ, আবার কোথাও গভীর অন্ধকার টানেলের ভেতর প্রবেশই হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় শোক দিবস পালন করলেও নেপালে উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখা হয়নি। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, প্রথম দিনের মতোই উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, স্থলপথ, আকাশপথ এবং টানেলের ভেতর—এই তিন স্তরে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, কোথাও কেউ আটকে আছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বিপর্যয়ে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৮০ ছাড়িয়েছে এবং ৫ হাজার ৫০০ জনের বেশি এখনো নিখোঁজ।
ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও উদ্ধারকারীদের আশাবাদী করে তুলেছে কয়েকটি ঘটনা। ভয়াবহ বন্যার পর গভীর টানেল থেকে নেপালি দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরে আরও এক চীনা নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এসব ঘটনায় অন্য নিখোঁজদেরও জীবিত পাওয়ার আশা নতুন করে তৈরি হয়েছে।
আর্নল্ড ডিক্সও মনে করছেন, এমন উদ্ধার সাফল্য পুরো অভিযানে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। তার বক্তব্যের মূল কথা—যতক্ষণ কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে, ততক্ষণ তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা থামানো যাবে না।
নেপালের উদ্ধার অভিযানে দেশটির নিজস্ব বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার আর্নল্ড ডিক্সও উদ্ধারকারীদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
ডিক্সের আগে ভারতের উত্তরাখণ্ডে সিলকিয়ারা টানেল দুর্ঘটনার সময়ও তার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ২০২৩ সালে সেখানে ৪১ জন শ্রমিক টানেলের ভেতর ১৭ দিন আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার হন।
ডিক্সের বক্তব্যে এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানবিক দিকটি। তার মতে, একটি উদ্ধার অভিযানের সাফল্য শুধু কতজনকে জীবিত বের করে আনা গেল, সেই সংখ্যায় মাপা যায় না। বরং যাদের উদ্ধার না করে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, তাদের জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াটাও সাফল্যের অংশ।
নেপালে এখন সেই চেষ্টাই অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়, কাদা, ধ্বংসস্তূপ আর টানেলের অন্ধকার পেরিয়ে উদ্ধারকারীরা খুঁজে চলেছেন নিখোঁজ মানুষদের।
এখনও অনেক পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। তাই জাতীয় শোকের মধ্যেও উদ্ধার অভিযান থামছে না—কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে কিংবা টানেলের গভীরে এখনো কেউ জীবিত থাকতে পারেন, সেই আশাটুকু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।