দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর গাজা উপত্যকায় আবারও সরাসরি স্কুলে পাঠদান শুরু হয়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে ভাঙাচোরা ভবন, তাঁবু ও টিনের অস্থায়ী ছাউনিতে ক্লাসে ফিরেছে শিশুরা। পর্যাপ্ত খাতা-কলম, স্কুলের পোশাক কিংবা প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না থাকলেও দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষক-সহপাঠীদের সামনে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে তারা। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য […]
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর গাজা উপত্যকায় আবারও সরাসরি স্কুলে পাঠদান শুরু হয়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে ভাঙাচোরা ভবন, তাঁবু ও টিনের অস্থায়ী ছাউনিতে ক্লাসে ফিরেছে শিশুরা। পর্যাপ্ত খাতা-কলম, স্কুলের পোশাক কিংবা প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না থাকলেও দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষক-সহপাঠীদের সামনে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে তারা।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের হিসাবে, সংঘাতের কারণে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশু দীর্ঘদিন সরাসরি স্কুলে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।
খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমদান জানান, ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২২ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৫৩২ শিক্ষকসহ ৭৭০ জনের বেশি শিক্ষাকর্মী নিহত হয়েছেন। এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও স্কুলে পাঠদান পুনরায় শুরু হওয়াকে তিনি আশার একটি ভঙ্গুর সূচনা হিসেবে দেখছেন।
খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়ায়েদ আবু মুস্তফা জানায়, তিন বছর আগে সর্বশেষ স্কুলে গিয়েছিল সে। নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনকে আনন্দ ও নতুন শুরুর একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে এই শিক্ষার্থী।
তবে ক্লাস করতে হচ্ছে তীব্র গরমের মধ্যে বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা একটি তাঁবুর মেঝেতে। ভালো জুতো কিংবা প্রয়োজনীয় খাতা-কলমও নেই তার। যুদ্ধের মধ্যে অনেক খেলাসঙ্গীকে হারিয়েছে মোয়ায়েদ। তারপরও যত প্রতিকূলতাই থাকুক, তাঁবুর নিচে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে সে।
বাস্তুচ্যুত পরিবারের সঙ্গে তাঁবুতে থাকা ১৫ বছর বয়সী সমর আবু সালমিও আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে। একটি অস্থায়ী স্কুলের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সে জানায়, দীর্ঘদিন মোবাইলের পর্দায় পড়াশোনা করতে হয়েছে এবং শিক্ষকদের সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। এখন এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুতে গিয়ে হলেও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় সে।
সমর জানায়, যুদ্ধের আগের সময়ে খাতা, কলম ও পোশাকসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সহজে এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত।
ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম শুরু করেছে গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য তেরপল, স্টিল, কাঠ ও তাঁবু ব্যবহার করে অস্থায়ী স্কুল তৈরি করা হয়েছে।
কোথাও এসব পাঠশালা বালুর ওপর স্থাপন করা হয়েছে। আবার কোনো শ্রেণিকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ড ও কয়েকটি গদি ছাড়া তেমন কোনো সরঞ্জাম নেই। কিছু স্কুল ভবনে এখনো বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বসবাস করছে।
১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ামেন আবু সামরা জানায়, আগে আনন্দ নিয়ে স্কুলে যেত সে। এখন স্কুলে আসার সময় গুলি, রকেট ও হামলার আশঙ্কা মাথায় থাকে। তীব্র রোদ ও গরমের মধ্যেই তাঁবুতে বসে ক্লাস করতে হচ্ছে বলেও জানায় সে।
গাজার শিক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে ইউনিসেফের সহায়তায় অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অস্থায়ী স্কুল ও লার্নিং সেন্টারে সরাসরি পাঠদানে অংশ নেবে। যারা স্কুলে উপস্থিত হতে পারছে না কিংবা গাজা ছেড়ে গেছে, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষাও চালু রাখা হয়েছে।
শিক্ষাসামগ্রীর সংকটের জন্য ইসরায়েলের আমদানিনিষেধকে দায়ী করেছেন গাজার স্থানীয় ব্যবসায়ী খালেদ আলিয়ান। তিনি জানান, আগে যে খাতার দাম ছিল ৩ শেকেল বা প্রায় ১ ডলার, এখন সেটিই ১৫ শেকেলে বিক্রি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
শিক্ষাসামগ্রী আটকে দেওয়া কিংবা স্কুলে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের সামরিক সংস্থা কোগাট কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইসরায়েল দাবি করে আসছে, হামাস সামরিক কাজে স্কুলগুলো ব্যবহার করে। হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
যুদ্ধবিরতির পরও গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির কারণে বড় ধরনের সংঘাত সাময়িকভাবে কমলেও সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে গাজায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যেই নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, দীর্ঘ সংঘাত ও বারবার বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার প্রায় সব স্কুলই ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের শেখার সুযোগ ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে।
তাঁবু, অস্থায়ী ছাউনি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মধ্যেই হোক, প্রায় তিন বছর পর সরাসরি পাঠদানে ফিরে আসাকে গাজার শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।