রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলায় প্রথমে তাকে এবং পরে পরিবারের আরও তিন সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে […]
ছবি: সংগৃহীত
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলায় প্রথমে তাকে এবং পরে পরিবারের আরও তিন সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে বাড়িতে তছনছ চালিয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
বৃহস্পতিবার রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। দুই আসামিই হত্যায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাদের এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ইয়াবা সেবন করে। পরে আরও ইয়াবা সংগ্রহের পর তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়। ছাদের পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতে থাকে। ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন এবং সেখানে কী করছেন জানতে চান।
পুলিশ জানায়, ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্কে দুই তরুণ গণপতিকে চুপ করিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গলায় থাকা গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
পুলিশের দাবি, গণপতিকে হত্যার সময়ের শব্দে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার করলে দুই আসামি তাদেরও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে মরদেহ দুটি এমনভাবে সরিয়ে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।
এরপর দুই আসামি নিচতলায় গিয়ে বাড়ির সিসিটিভি ব্যবস্থা অচল করার চেষ্টা করে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সিদ্ধার্থ পুরোনো প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে দেয়। পরে তারা আবার বাড়ির ভেতরে ফিরে আসে।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, দোতলায় ঢোকার সময় গণপতি চক্রবর্তীর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ তাদের দেখে ফেলে এবং সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে। এরপর তাকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
চারজনকে হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এজন্য ঘরের আলমারি, ড্রয়ার, জামাকাপড়, খাতা ও বই এলোমেলো করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নগদ এবং স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়।
পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তায় মানুষের চলাচল কম থাকার সুযোগ নিয়ে দুই আসামি বাড়ির ছাদ ও পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার করে এলাকা ত্যাগ করে। পুলিশ জানিয়েছে, স্বর্ণালংকারের একটি ব্যাগ পরে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।
দুই আসামির একজন মুগ্ধকে হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের একটি শ্মশান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলেছে, সেখানে গিয়ে সে আশ্রয় ও পানি চেয়েছিল এবং কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছিল। বিদ্যুৎ দাস তাকে আশ্রয় না দিয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে। বিদ্যুৎ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ময়নাতদন্তের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। আসামি দুজনের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ পরীক্ষার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তদন্তে নিহতদের মরদেহ থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তবে মামলাটি নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রশ্নও উঠেছে। আসামিদের পরিবারের সদস্যরা তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেছেন। পাশাপাশি পুলিশের দেওয়া কিছু তথ্য নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় মামলাটি পরে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। অধিকতর তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়ার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ডিবির ভাষ্য, আসামিদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্তের তথ্য এবং অন্যান্য আলামত মিলিয়ে ঘটনাটি আরও যাচাই করা হচ্ছে।
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। চারজনের শেষকৃত্যও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।