ইন্টারনেটের একটি মিম নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের রসিকতা থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের ফুটবল ও বাণিজ্যজগতে। ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছে চীন। এর জেরে দেশটির তিনটি প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বন্ধ করেছে স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুঃখ […]
ছবি: সংগৃহীত
ইন্টারনেটের একটি মিম নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের রসিকতা থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের ফুটবল ও বাণিজ্যজগতে। ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছে চীন। এর জেরে দেশটির তিনটি প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বন্ধ করেছে স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এমবাপ্পে, লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদ। তবে তাতেও চীনের অসন্তোষ কাটেনি।
প্রশ্ন উঠেছে, ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল লিগ এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্লাবগুলোর একটি রিয়াল মাদ্রিদ কেন চীনের প্রতিক্রিয়ার পর এত দ্রুত ক্ষমা চাইতে গেল? এর পেছনে রয়েছে চীনের বিশাল দর্শকবাজার, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত বিপুল বাণিজ্যিক স্বার্থ।
যেভাবে শুরু হলো বিতর্ক
ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের অবয়ব ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও ভালো লাগার কথা বলেন। চীনে মাওকে ঘিরে এ ধরনের রসিকতা অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটিতে ক্ষোভ তৈরি হয়।
গত ২৭ অক্টোবর ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড নামের তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করে। একই সময়ে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করে।
এমবাপ্পে দুঃখ প্রকাশের পর লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদও ক্ষমা চায়। তবে সিএমজির দাবি, রিয়াল মাদ্রিদকে যথাযথভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। সংকট নিরসনে লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবাস চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ ছাড়া তাঁর চীন সফরেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
লা লিগার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ চীন
লা লিগার আয়ের অন্যতম বড় উৎস আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব। এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে লিগটির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪৮ মিলিয়ন ইউরো। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলেই এ আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জোগায়। তবে চীন থেকে এককভাবে কত আয় হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ চীনের বিপুল দর্শকগোষ্ঠী সম্প্রচারস্বত্বের বাজারমূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এশিয়ার দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে ২০১৬ সাল থেকেই ম্যাচের সময়সূচি এ অঞ্চলের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেয় লা লিগা। চীনে দুটি কার্যালয়সহ আটটি দেশে মোট নয়টি অফিস স্থাপন করেছে সংস্থাটি।
২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি চুক্তি করে লা লিগা। ওই চুক্তির মূল্য ছিল ৩৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি।
সম্প্রতি চায়না মোবাইলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগুর সঙ্গে ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৯-৩০ মৌসুম পর্যন্ত নতুন চুক্তি করেছে লা লিগা। এর আওতায় চীনের দর্শকেরা প্রতি মৌসুমে লিগের ৩৮০টি ম্যাচই দেখতে পারবেন। চুক্তির আর্থিক অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ২০২৪ সালে চায়না মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গেও বিনা মূল্যে সম্প্রচারের চুক্তি করেছিল লিগটি।
রিয়াল মাদ্রিদের বাণিজ্যিক স্বার্থ
চীনের বাজার রিয়াল মাদ্রিদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে ক্লাবটির জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি, স্পনসরশিপ এবং ব্র্যান্ডের পরিচিতি—সব ক্ষেত্রেই বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুযায়ী, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগের হিসাবে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ক্লাবটির মোট রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৬১ মিলিয়ন ইউরো।
এ ছাড়া ক্লাবটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান হাইসেন্স ও লিংলং টায়ার। ফলে চীনের বাজারে ক্লাবটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে পণ্য বিক্রি, স্পনসরশিপ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর।
চীনের ক্রীড়াবাজারে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
চীনের ক্রীড়াবাজারের গুরুত্ব শুধু বর্তমান বাণিজ্যিক আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রীড়াশিল্পের আকার ৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৪ সালে এ শিল্পের উৎপাদনমূল্য ছিল ৩ দশমিক ৮৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।
অর্থাৎ, চীন বর্তমানে বড় দর্শক ও ভোক্তাবাজার হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও ক্রীড়াবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। এই বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক ধরে রাখা লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এমবাপ্পের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক তাই কেবল একজন ফুটবল তারকার ব্যক্তিগত মন্তব্য বা একটি সম্প্রচার বন্ধের ঘটনা নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে বৃহৎ আন্তর্জাতিক বাজারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং সেই বাজারের প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আবারও সামনে এনেছে।