জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন বাজেটে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিশুখাদ্য, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও স্বাস্থ্যসেবায় কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে সিগারেট, তেলচালিত গাড়ি, বিদেশি কাজুবাদাম, মধু ও বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। ফলে সাধারণ […]
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন বাজেটে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিশুখাদ্য, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও স্বাস্থ্যসেবায় কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে সিগারেট, তেলচালিত গাড়ি, বিদেশি কাজুবাদাম, মধু ও বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।
ফলে সাধারণ মানুষের জন্য যেমন কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির খবর রয়েছে, তেমনি কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তে পারে খরচ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ দাম, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ক্রমবর্ধমান খরচের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট।
ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, বিগত বছরগুলোয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
আমদানি করা শিশুখাদ্য প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীর ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে (শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে)। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এতে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে।
জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়া ইত্যাদি মসলায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দাম কমতে পারে।
সোনা সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ভ্যাট ছিল আগে ৫ শতাংশ। ফলে আড়াই লাখ টাকার সোনায় ভ্যাট দাঁড়াত সাড়ে ১২ হাজার টাকা। এখন তা কমিয়ে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকেলে (ইভি) নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে এসব গাড়ির দাম অনেকটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার স্টেশন বসাতে ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে।
যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ক্ষেত্রেও করছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কমানো হয়েছে।
ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে কিডনি রোগীর প্রতিবার ডায়ালাইসিস সেবায় ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমবে।
ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বাদ্যযন্ত্র এবং এর যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বৃদ্ধি করায় সেগুলোর দাম বাড়তে পারে।
সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য নিম্নস্তরের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা ৬২ টাকা, মধ্যম স্তর ৯২ টাকা, উচ্চ স্তর ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তর ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে সিগারেটের দাম বাড়বে।
নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ডিজেল, অকটেন বা পেট্রলচালিত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে ১,২০০ থেকে ১,৬০০ সিসি ইঞ্জিনক্ষমতার আমদানি করা গাড়ির ওপর করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়বে।
দেশীয় চাষ ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
দেশীয় মৎস্য প্রক্রিয়াকরণশিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
কম্পোজিট এলপিজি সিলিন্ডার আমদানিতে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, ফলে এর দাম বাড়তে পারে।
বিদেশ থেকে প্রাকৃতিক মধু আমদানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ইউনিটপ্রতি ২ ডলার বাড়িয়ে ৭ ডলার করা হয়েছে। বিদেশি সুপারি আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সুগার কনফেকশনারি, কফি, প্রস্তুত খাদ্যপণ্য, লিপ লাইনার, লিপ জেলসহ বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে।
রড তৈরির বিভিন্ন উপকরণের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। ফলে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে রডের দামও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বিদেশি টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বেসিন, ফোম, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, সাইকেল ও যন্ত্রাংশ, খেলনা এবং কিছু প্রসাধনীর দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই কর ও শুল্ক কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।