ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য তৈরি করা তথাকথিত ‘আসক্তি তৈরির’ (অ্যাডিকটিভ) ডিজাইন পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। নির্দেশনা কার্যকর না হলে মেটাকে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন। ব্রাসেলস থেকে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় […]
ছবি: সংগৃহীত
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য তৈরি করা তথাকথিত ‘আসক্তি তৈরির’ (অ্যাডিকটিভ) ডিজাইন পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। নির্দেশনা কার্যকর না হলে মেটাকে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন।
ব্রাসেলস থেকে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা। কমিশনের অভিযোগ, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কিছু নকশাগত বৈশিষ্ট্য ব্যবহারকারীদের স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখতে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে।
ইইউ যেসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আপত্তি তুলেছে, তার মধ্যে রয়েছে অবিরাম স্ক্রল (ইনফিনিট স্ক্রল), অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিউজ ফিড এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু (অটোপ্লে) হওয়ার সুবিধা।
ইইউর প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান হেনা ভিরক্কুনেন এক বিবৃতিতে বলেন, ইউরোপের মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিগ টেক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক মূল্যায়নে ইউরোপীয় কমিশন জানায়, ইইউর ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) লঙ্ঘনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, মেটাকে প্ল্যাটফর্মের নকশায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ডিফল্টভাবে অটোপ্লে ও ইনফিনিট স্ক্রল বন্ধ রাখা, কার্যকর স্ক্রিন-টাইম বিরতির ব্যবস্থা চালু করা এবং ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিবর্তে সুপারিশভিত্তিক অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরতা কমানো।
তবে মেটা জানিয়েছে, তারা কমিশনের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়। তারপরও বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইউরোপীয় কমিশনের এই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে, মেটাকে তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
তবে ইইউর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য জরিমানা করা নয়; বরং প্ল্যাটফর্মগুলোর আচরণে বাস্তব পরিবর্তন আনা।
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। আগামী সোমবার ইউরোপীয় কমিশনের বিশেষজ্ঞ প্যানেল শিশুদের অনুপযুক্ত অনলাইন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষার বিষয়ে সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল টিকটককেও। সেবারও প্ল্যাটফর্মটির ডিজাইন পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে বড় অঙ্কের জরিমানার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের আওতায় ২০২৪ সালে মেটার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ইইউ। শুক্রবারের মূল্যায়নে কমিশন জানায়, বর্তমানে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে থাকা স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জামগুলো সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায়। একই সঙ্গে অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ব্যবহারকারীদের জন্য যথেষ্ট সহজ নয়।
কমিশনের আরও অভিযোগ, শিশুদের রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় অ্যাপ ব্যবহার এবং রিলস ও স্টোরিজের মতো ফিচার কীভাবে অতিরিক্ত ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে, সে বিষয়ে মেটা যথাযথ মূল্যায়ন করেনি।
অন্যদিকে মেটার দাবি, কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ইতোমধ্যে ‘টিন অ্যাকাউন্ট’ চালু করেছে। এই সুবিধার মাধ্যমে অভিভাবকেরা রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার সীমিত করতে এবং দৈনিক স্ক্রিন-টাইম ১৫ মিনিটে নির্ধারণ করতে পারেন।
একই তদন্তের অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে ইইউ অভিযোগ করেছিল, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার কার্যকরভাবে ঠেকাতে পারেনি মেটা। ফলে তারা অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যবহারকারীদের ক্রমাগত একই ধরনের বা আরও চরমপন্থী কনটেন্টের দিকে ঠেলে দেওয়ার তথাকথিত ‘র্যাবিট হোল’ প্রভাব নিয়েও তদন্ত করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রেও মেটা একই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। চলতি বছরের এক মামলায় আদালত মন্তব্য করেন, মেটার প্ল্যাটফর্ম এবং ইউটিউবের কিছু নকশা ব্যবহারকারীদের জন্য ক্ষতিকর মাত্রার আসক্তি তৈরি করতে পারে।
সূত্র: এএফপি