সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

অর্থনীতি
৪:০৮ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: ১০ বছরেও নেই কোনো অগ্রগতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি—রিজার্ভ চুরির ঘটনা—পেরিয়ে গেছে এক দশক। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ৯২ বার তারিখ পরিবর্তনের পরও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অতি গোপনীয় কোড হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক […]

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: ১০ বছরেও নেই কোনো অগ্রগতি

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি—রিজার্ভ চুরির ঘটনা—পেরিয়ে গেছে এক দশক। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ৯২ বার তারিখ পরিবর্তনের পরও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অতি গোপনীয় কোড হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি করা হয় ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ঘটনার দেড় মাস পর মামলা হলেও তদন্তের গতি ছিল শুরু থেকেই শ্লথ। দশ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার অভিযোগপত্র আলোর মুখ দেখেনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের মধ্যভাগে ঘটে যাওয়া এই চুরির ঘটনার রহস্য উন্মোচনে পরবর্তী আট বছরেও কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় পৌনে দুই বছরেও মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসেনি। ফলে এ ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।

সিআইডির সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. শাহ আলম অভিযোগ করে বলেন, রিজার্ভ চুরির পর মামলা করতে বিলম্ব, তথ্য গোপন রাখা এবং বিদেশি সংস্থাকে এনে পরিকল্পিতভাবে আলামত নষ্ট করার মতো নানা অসহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাঁর ভাষায়, ‘তিন-চারটা কম্পিউটারে সার্ভারের কাজ হতো। সেগুলো থেকে চুরির সুযোগ ছিল না। কারা সহায়তা করেছে, সেটাও আমরা চিহ্নিত করেছি। তারা সার্ভার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।’

২০২৪ সালে সিআইডির একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ১২ জন কর্তা-কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, সুইফট সার্ভার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান সুইফটের মাধ্যমে আন্তব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থা আরটিজিএসের সংযোগ দেওয়ার অনুমোদন দেন এবং তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেন। তদন্তে চুরি করা অর্থের সুবিধাভোগী এবং সুইফট সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামও উঠে আসে।

এ প্রসঙ্গে মো. শাহ আলম বলেন, ‘যখন প্রশ্ন উঠেছে কেন সুরক্ষিত সিস্টেমকে অরক্ষিত করার সুযোগ দেওয়া হলো, তখন তারা একটি অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু সেই অজুহাত আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘উদ্যোগে বড় ধরনের গ্যাপ ছিল। এটা ষড়যন্ত্রের অংশও হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অবহেলাও ছিল। সিআইডি হিসেবে আমরা যে মাত্রার সহায়তা প্রত্যাশা করেছিলাম, তা পাইনি।’

এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও রিজার্ভ চুরির ঘটনা পরবর্তী তিন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বোর্ড সভায় গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়নি। পাশাপাশি অপরাধ কার্যক্রম পাঁচটি দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় একাধিক সংস্থার সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছিল অনেকটাই উদাসীন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও অর্থনীতিবিদ ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেটার কোনো ফলোআপ হয়নি, এমনকি প্রতিবেদনটি প্রকাশও করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই মামলায় দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সাড়ে তিন বছর বোর্ডে ছিলাম, কিন্তু এই বিষয়গুলো নিয়ে কখনো আলোচনা হয়নি। এজেন্ডায় না এলে তো কাজ করা যায় না।’

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিপিন্সে একপাক্ষিক অর্থ চুরির মামলায় দেশটির আরসিবিসি ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন ঢাকার একটি বিশেষ আদালত। তবে এ সিদ্ধান্তের পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি বা স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘মামলাটি বর্তমানে বাংলাদেশ ও ফিলিপিন্সের মধ্যে চলমান রয়েছে।’

সর্বশেষ অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য আদালত ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করলেও সেটিও পিছিয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে মোট ৯২ বার সময় বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে আগামী ৯ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে। তবে এক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, এই তারিখেও আদৌ অভিযোগপত্র জমা হবে কি না—তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়ে গেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ