ব্রাজিলের উপকূল থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ছোট দ্বীপ ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্দে। বিশ্বজুড়ে এটি বেশি পরিচিত ‘স্নেক আইল্যান্ড’ বা ‘সাপের দ্বীপ’ নামে। কারণ, দ্বীপটি হাজার হাজার বিষধর সাপের আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে এমন একটি প্রজাতি, যা পৃথিবীর আর কোথাও স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না। দ্বীপটিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। গবেষণা বা বিশেষ […]
ছবি: সংগৃহীত
ব্রাজিলের উপকূল থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ছোট দ্বীপ ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্দে। বিশ্বজুড়ে এটি বেশি পরিচিত ‘স্নেক আইল্যান্ড’ বা ‘সাপের দ্বীপ’ নামে। কারণ, দ্বীপটি হাজার হাজার বিষধর সাপের আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে এমন একটি প্রজাতি, যা পৃথিবীর আর কোথাও স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না।
দ্বীপটিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। গবেষণা বা বিশেষ প্রয়োজনে অনুমোদন নিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও বিরল সাপের আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টিও এই বিধিনিষেধের অন্যতম কারণ।
ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্দে ব্রাজিলের সাও পাওলো উপকূলের কাছে অবস্থিত। গবেষণা ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটির আয়তন প্রায় ৪৩ হেক্টর এবং এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের ফলে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতার কারণে সেখানে বসবাসকারী সাপগুলো আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে।
এই বিচ্ছিন্ন পরিবেশেই বিশেষ প্রজাতির সাপ গোল্ডেন ল্যান্সহেড বা জারারাকা-ইলহোয়া বিকশিত হয়েছে। এটি মূলত দ্বীপটির নিজস্ব একটি প্রজাতি।
গোল্ডেন ল্যান্সহেড একটি পিট ভাইপার। এর দৈর্ঘ্য সাধারণত এক মিটারের কম হলেও এটি বিষধর। তবে সাপটির কামড়ে মানুষের মৃত্যুর নথিভুক্ত ঘটনা খুবই কম। জীববিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে, এটি সাধারণভাবে মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মকও নয়।
এই সাপের প্রধান খাদ্য পরিযায়ী পাখি। গবেষণায় দেখা গেছে, Chilean elaenia ও yellow-legged thrush-এর মতো পাখি এর শিকারের মধ্যে রয়েছে। দ্বীপে স্থায়ীভাবে থাকা southern house wren ও bananaquit তুলনামূলকভাবে সাপের আক্রমণ এড়িয়ে চলতে পারে।
পাখি ধরার জন্য দ্রুত কাজ করা বিষ এই সাপের টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়। মূল ভূখণ্ড থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর দ্বীপের পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় এই বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে।
ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্দে নিয়ে প্রচলিত অনেক গল্পে বলা হয়, দ্বীপের প্রায় প্রতিটি জায়গায় সাপ দেখা যায় কিংবা প্রতি বর্গমিটারে একটি করে সাপ রয়েছে। তবে গবেষণাভিত্তিক হিসাব এই ধারণাকে সমর্থন করে না।
গবেষকদের অনুমান, দ্বীপে গোল্ডেন ল্যান্সহেডের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার থেকে ৪ হাজার। দ্বীপটির আয়তন বিবেচনায় নিলে প্রতি সাপের জন্য গড়ে ১০০ বর্গমিটারেরও বেশি জায়গা পড়ে। অর্থাৎ পুরো দ্বীপজুড়ে অস্বাভাবিক ঘনত্বে সাপ ছড়িয়ে আছে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
দ্বীপটিতে অবতরণ নিষিদ্ধ। এর একটি কারণ মানুষের নিরাপত্তা, অন্যটি বিরল প্রজাতির সাপ ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ। ব্রাজিলের সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের নথিতে দ্বীপে অননুমোদিত অবতরণ নিষিদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রেও পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়।
গোল্ডেন ল্যান্সহেডকে সংকটাপন্ন প্রজাতি হিসেবে সংরক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছে। অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী সংগ্রহ ও পাচারও এ প্রজাতির জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
দ্বীপের সাপ নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গোল্ডেন ল্যান্সহেডের একটি সাপ অবৈধ বাজারে বিপুল দামে বিক্রি হতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণেও দ্বীপে মানুষের অবাধ প্রবেশ রোধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
‘স্নেক আইল্যান্ড’ নামটি দ্বীপটিকে ঘিরে ভয়ংকর নানা গল্পের জন্ম দিয়েছে। তবে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, গোল্ডেন ল্যান্সহেড সাধারণভাবে মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক নয় এবং মানুষের কাছাকাছি গেলেই আক্রমণ করবে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। মানুষের ওপর এই সাপের কামড়ের নথিভুক্ত ঘটনাও খুব কম।
তবু দ্বীপটি অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্গম ও পাথুরে ভূপ্রকৃতি, বিষধর সাপের উপস্থিতি এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা থেকে দূরত্ব—সব মিলিয়ে সেখানে অবাধে প্রবেশের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এই বিরল প্রজাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল রক্ষাও বিধিনিষেধের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।