ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট আতঙ্ক ও হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে এক শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যার এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় শনাক্ত করা […]
ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট আতঙ্ক ও হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে এক শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যার এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন নেত্রকোনার পূর্বধলার বশী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার রাঙ্গামাটিয়া এলাকার শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার রমজান (৩৮) ও জাহানারা (৫০) এবং ময়মনসিংহের তারাকান্দার বালিখা এলাকার কুলসুমা (৩৫)। নিহত শিশুটির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের ওপরের অংশ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে শিশু ওয়ার্ডে আগুন লাগার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও পরে জানা যায়, ভবনের অষ্টম তলার ছাদে থাকা ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত।
ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রাণভয়ে গুরুতর অসুস্থ রোগীরাও স্বজনদের সহায়তায় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় সিঁড়িতে ধাক্কাধাক্কি ও হুড়োহুড়ির মধ্যে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে আহত রোগীদের ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে ছুটতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও রোগীদের কয়েকজন জানান, হঠাৎ প্রচণ্ড ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর সবাই একসঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
খবর পেয়ে ময়মনসিংহ সদর ফায়ার স্টেশন ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফায়ার স্টেশন থেকে মোট ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এর মধ্যে চারটি ইউনিট হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, স্টাফ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনে তল্লাশি ও উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করেন।
ময়মনসিংহ সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাজ উদ্দিন ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান জানান, প্রাথমিকভাবে লিফটের মেশিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়া অথবা শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, লিফটের কন্ট্রোল রুম অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে আগুন ধরে যায় এবং সেখান থেকে প্রচুর ধোঁয়া বের হয়। বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি না হলেও ধোঁয়ার কারণে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর রোগীদের ধীরে ধীরে তাদের শয্যায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পুরো ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখতে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান। তিনি হাসপাতালের লিফট ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, হাসপাতালে লিফট প্রায়ই অচল থাকে, যা রোগীদের ভোগান্তি বাড়ায়।
লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কোনো গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। এর আগেও হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারও অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। সচেতন মহলের মতে, সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য ধোঁয়াতেই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। এ ঘটনা হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।