সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

সারাবাংলা
২:৩২ পূর্বাহ্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

যে গাছের ডাল ভাঙে না পাতা ছেঁড়ে না কেউ

দুটি ফুটবল মাঠের সমান জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে আছে গাছটি। বিজ্ঞানীদের ভাষায় পাকুড় গাছ হলেও স্থানীয়রা চেনেন বটগাছ নামে। কয়েকশ বছরের পুরোনো এই গাছের কোথায় কাণ্ড আর কোথায় শেকড় তা খুঁজে পাওয়া যায় না। এর কাণ্ড শেকড় আর ডালপালার ভেতরেই বসবাস করেন কয়েকশ মানুষ। গাছটিকে কেন্দ্র করে যেমন পূঁজা অর্চনার নানান আয়োজন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা, তেমনি […]

যে গাছের ডাল ভাঙে না পাতা ছেঁড়ে না কেউ
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

দুটি ফুটবল মাঠের সমান জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে আছে গাছটি। বিজ্ঞানীদের ভাষায় পাকুড় গাছ হলেও স্থানীয়রা চেনেন বটগাছ নামে। কয়েকশ বছরের পুরোনো এই গাছের কোথায় কাণ্ড আর কোথায় শেকড় তা খুঁজে পাওয়া যায় না। এর কাণ্ড শেকড় আর ডালপালার ভেতরেই বসবাস করেন কয়েকশ মানুষ। গাছটিকে কেন্দ্র করে যেমন পূঁজা অর্চনার নানান আয়োজন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা, তেমনি মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা সম্মান করেন এটিকে। যে কারণে কেউ এই গাছের ডাল ভাঙে না, পাতাও ছেঁড়েন না।

বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামে ঐতিহাসিক এই গাছটির অবস্থান। নগরীর বেলতলা থেকে খেয়া পার হয়ে এখানে পৌঁছাতে সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট।

দূর থেকে দেখলে মনে হবে বিশাল এক জঙ্গল। অনেকগুলো গাছ মিলে যেন ঘিরে রেখেছে বড় এক এলাকা। অবশ্য কাছে গেলেই ভুল ভাঙবে। অনেকগুলো নয়, কেবল একটি মাত্র গাছই ঘিরে রেখেছে দুটি গ্রাম। স্থানীয়দের মতে এই গাছের বয়স সাড়ে তিনশ বছর।

স্থানীয় একজন বয়স্ক বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে গাছটারে এমনই দেখতেছি। আমার দাদার দাদায়ও দ্যাখছে এইরকমই। এইজন্যই আমরা হিসাব কইরা কই, এই গাছের বয়স কমপক্ষে সাড়ে তিনশ বছর।’

সাড়ে ৫ একর জমিতে বেড়ে ওঠা গাছটি ঘিরেই গড়ে উঠেছে দুটি গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দাই সনাতন ধর্মের অনুসারী। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের লোককথায় উঠে এসেছে, প্রাচীনকালে মাটি ফুঁড়ে বের হয়েছিল একটি শিব লিঙ্গ; যা গাছের কোনো এক শাখার মাঝে অবস্থিত। সেটি ঘিরে এখনও হয় নানান পূজা অর্চনা। কেউ কেউ মানত করেন, মানত পূরণ হলে চুল ফেলে দেন এখানেই। কেউবা মন্দিরে দান করেন মানতের টাকা। অক্ষয় তৃতীয়া, কালী পূজাতে এই গাছটির পাশে থাকা মন্দিরে হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নানা উৎসব।

গাছটি ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন কল্পকথা। যেমন- ‘গাছের পাতা ছিঁড়লে এবং ডাল ভাঙলে হয় অমঙ্গল।’ তাই ক্ষতির ভয়ে এই গাছের মগডালে উঠে সৌন্দর্য দেখতেও রাজি হন না কেউ।

এখানকার বাসিন্দা নমিতা বলেন, ‘বহু বছর আগে গাছটি কাটার চেষ্টা করেছিলেন স্থানীয় একজন। কারণ গাছের ঝুড়ি তার জমিতে গিয়ে পড়েছিল। তাই গাছ কাটার চেষ্টা করলে লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। এমন আরও কিছু ঘটনার পর আমরা কেউই এই গাছের পাতা ছিঁড়ি না, পাতা কুড়িয়ে নিই না, এমনকি ডালও ভাঙি না’।

রাজার চরের ছোট মন্দির এলাকার অশীতিপর মো. মোস্তফা বলেন, ‘আমার দাদুর কাছে শুনছি, দাদু তার দাদুর কাছে শুনছেন-এই গাছের পাশে একটা খাল ছিল। পূর্ণিমা রাতে সেই খালে ভেসে আসতো সোনার হাড়ি-পাতিল। একবার এক লোকে লোভে পড়ে ভেসে আসা পাতিল চুরি করে। সেই লোকটা মরে যান এবং এরপরই খাল শুকিয়ে যায়’। এসব কল্পকথার কোনো প্রমাণ না মিললেও লোকমুখে প্রচলিত আছে এই গল্পগুলো।

পরিবেশ প্রেমী এলবার্ট রিপন বল্লভ বলেন, ‘ডাল না ভাঙা এবং কোনো ধরনের ক্ষতি না করায় প্রাচীন গাছটি নিজের মতো করে ছড়িয়েছে তার নিজস্ব ধারায়। এখানে মানুষ যেমন প্রকৃতির কোমলতায় ঘিরে থাকে, তেমনি নিশ্চিন্তে আশ্রয় নেয় পাখিরা। প্রকৃতি আমাদের এক অফুরন্ত সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে।’

প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এই গাছ দেখতে ভিড় জমান অনেক মানুষ। তবে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় তাদেরকে পরতে হয় চরম বিপাকে। স্থানীয়দের দাবি-একটি ভালো রাস্তা নির্মাণের; যেন দূর-দূরান্ত থেকে এখানে নির্বিঘ্নে লোকজন আসতে পারেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা- অক্সিজেনের প্রাকৃতিক এই খনিটি হাজার বছর টিকে থাকুক কার্বন নিঃসরণের এই জমানায়। ভরসা হয়ে থাকুক পাখি আর এখানকার মানুষের জীবনে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ