বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই জমা হয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ দশমিক […]
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই জমা হয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট ঋণস্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
খেলাপি ঋণের পরিমাণে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির মোট ঋণস্থিতি প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণ প্রায় ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৯৭ শতাংশই খেলাপি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকটির বড় অংশের ঋণ আগের সময়ে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় বিতরণ করা হয়েছিল। এই ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় আরও রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এবি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে প্রায় ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি, ২৮ হাজার ৫২০ কোটি, ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি, ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি এবং ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকার ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাবে ঋণ বিতরণ খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কয়েকটি ব্যাংক নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, আরামিট, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ ও হলমার্কসহ বিভিন্ন আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণের বড় অংশ বর্তমানে খেলাপি।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, এসব ঋণের অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পদ নেই। বড় ঋণগ্রহীতাদের কেউ বিদেশে, কেউ কারাগারে, আবার কেউ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে আদালতের মাধ্যমে ডিক্রি পাওয়ার পরও অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের প্রায় ৫৬ শতাংশই শীর্ষ পাঁচটি গ্রুপের কাছে। এসব ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই কারাগারে রয়েছেন অথবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তাঁর মতে, অনেক নন-ফান্ডেড ঋণ পরবর্তী সময়ে ফান্ডেড ঋণে পরিণত হওয়ায় পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পদও নেই।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বলে ব্যাংকটির তথ্য থেকে জানা যায়। ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের একটি বড় অংশ ওই গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ব্যাংক সূত্রের হিসাবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে ঋণ নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে এবং এর ফল আগামী প্রান্তিকে দেখা যেতে পারে।
তাঁর দাবি, এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণ বাদ দিলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২৩ শতাংশের নিচে।
খেলাপি ঋণ কমাতে গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধ, সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন সুযোগ দিয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিলের সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এসব সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ কমেনি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বারবার পুনঃতফসিল ও ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে আসলে খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে কি না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, খেলাপি ঋণ শনাক্ত ও আদায়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শিথিলতা ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর করতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ কমেনি। একই ঋণগ্রহীতাকে বারবার ছাড় দেওয়ার ফলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের মধ্যেই ভুল বার্তা তৈরি হয়েছে।
বড় ঋণখেলাপিরা ভবিষ্যতেও ছাড় পাওয়ার আশা করলে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ আরও কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কর্মসংস্থান রক্ষার প্রয়োজনে অযোগ্য ব্যবসায়ীকে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি সহায়তা দেওয়ার পক্ষেও মত দেন এই অর্থনীতিবিদ।
ব্যাংকারদের মতে, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করার সুযোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করে দ্রুত আদায়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।
অর্থঋণ আদালতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, বন্ধকি সম্পদ বিক্রির কার্যকর ব্যবস্থা এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনসহ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীর অর্থ, ব্যাংকের মূলধন, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের পাশাপাশি পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা জড়িত।
মাত্র ১০টি ব্যাংকে যখন ব্যাংক খাতের প্রায় ৭২ শতাংশ খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত, তখন সংকটের বড় অংশ যে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক ও বড় ঋণগ্রহীতাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট।
এখন মূল প্রশ্ন শুধু কত টাকা খেলাপি হয়েছে, তা নয়। যে বিপুল অর্থ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে, তার কতটা ফেরত আনা সম্ভব এবং কত দ্রুত তা আদায় করা যাবে, সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।