সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

রিভিউ
৬:০৫ অপরাহ্ন, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালের বিপর্যয়ের ভিডিও ভেবে কাঁদছিলেন অনেকে, বেরিয়ে এলো চমকে দেওয়া সত্য

পিঠে ছোট্ট বোনকে শক্ত করে বেঁধে কাদামাখা পথে হাঁটছে এক শিশু। বোনটি কাঁদছে, আর ছেলেটি বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে। ভিডিওটি দেখলে মনে হয়, কোনো ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে বাবা-মাকে হারিয়ে বোনকে নিয়ে একাই পথে নেমেছে ছোট্ট ভাইটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক এমন একটি গল্পই ছড়িয়ে পড়েছিল। বলা হচ্ছিল, নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে […]

নেপালের বিপর্যয়ের ভিডিও ভেবে কাঁদছিলেন অনেকে, বেরিয়ে এলো চমকে দেওয়া সত্য

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

পিঠে ছোট্ট বোনকে শক্ত করে বেঁধে কাদামাখা পথে হাঁটছে এক শিশু। বোনটি কাঁদছে, আর ছেলেটি বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে। ভিডিওটি দেখলে মনে হয়, কোনো ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে বাবা-মাকে হারিয়ে বোনকে নিয়ে একাই পথে নেমেছে ছোট্ট ভাইটি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক এমন একটি গল্পই ছড়িয়ে পড়েছিল। বলা হচ্ছিল, নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দুই ভাই-বোন। বোনকে পিঠে নিয়ে বাবা-মায়ের খোঁজে বেরিয়েছে ওই শিশু।

ভিডিওটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অসংখ্য মানুষ। কেউ তাকে ‘নায়ক’, কেউ ‘বীর’ বলে আখ্যা দেন। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে তৈরি বিখ্যাত অ্যানিমেটেড সিনেমা গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস-এর ভাই-বোনের সঙ্গেও তুলনা করা হয় তাদের।

কিন্তু ভিডিওটির আসল গল্প শুনলে চমকে যেতে হয়।

নেপালের নয়—ভিডিওটি কোথাকার?

আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধান এবং দ্য স্টেটসম্যান-এর প্রতিবেদনে জানা গেছে, ভাইরাল ভিডিওটি আসলে নেপালের নয়।

অনুসন্ধানে ভিডিওটির স্থান হিসেবে উঠে এসেছে উত্তর ভিয়েতনামের হা জিয়াং প্রদেশের নাম।

হা জিয়াং এলাকার থিয়েন ডুয়েন নামে স্থানীয় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রথম ওই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেন। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিওকে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল নেই।

তাহলে কারা এই দুই শিশু?

ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে, সেটি যে সত্যিকারের একটি হৃদয়বিদারক মুহূর্ত—সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বড় শিশুটি ছোট বোনকে পিঠে নিয়ে হাঁটছে, আর শিশুটিকে দেখে বোঝা যায় সে অস্বস্তিতে ও ক্লান্তিতে রয়েছে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দুই শিশুর প্রকৃত পরিচয় কিংবা তাদের সেই মুহূর্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তারা সত্যিই বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল কি না, কিংবা কোনো দুর্যোগের কারণে তারা সেখানে এমন অবস্থায় পড়েছিল কি না—এমন তথ্যও নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

ফলে ভিডিওর দৃশ্য সত্য হলেও এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া পুরো গল্পটি সত্য নয়।

কেন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল ভিডিওটি?

এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দৃশ্যটির আবেগঘন দিক।

পিঠে দুধের শিশুকে নিয়ে কাদার মধ্যে হাঁটছে আরেক শিশু—এই একটি দৃশ্যই দর্শকের মনে অসহায়ত্ব, দায়িত্ববোধ ও ভাই-বোনের টানকে সামনে নিয়ে আসে। তার সঙ্গে যখন ‘নেপালের দুর্যোগ’, ‘বাবা-মাকে হারানো’ কিংবা ‘ভাইয়ের সাহস’—এমন গল্প জুড়ে দেওয়া হয়, তখন ভিডিওটি আরও দ্রুত মানুষের আবেগ স্পর্শ করে।

অনেকেই যাচাই না করেই ভিডিওটি শেয়ার করেছেন। কেউ আবার সেটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

নাগাসাকির সেই ছবির কথা কেন মনে পড়ল?

ভাইরাল ভিডিওটির দৃশ্য অনেককে মনে করিয়ে দিয়েছে ১৯৪৫ সালে নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর তোলা সেই ঐতিহাসিক ছবির কথা।

ওই ছবিতে এক কিশোরকে দেখা গিয়েছিল পিঠে মৃত ছোট ভাইকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। যুদ্ধের নির্মমতার প্রতীক হয়ে যাওয়া সেই ছবির সঙ্গে নতুন ভিডিওটির দৃশ্যের মিল থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগ আরও বেড়ে যায়।

তবে দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট এক নয়। ভাইরাল ভিডিওটির শিশুদের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত, আর ভিডিওটি নেপালেরও নয়।

সত্য কী, আর ভাইরাল দাবি কী?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভিডিওটি আসল হলেও এর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া নেপালের গল্পটি যাচাইয়ে সত্য প্রমাণিত হয়নি।

শিশু দুটিকে ঘিরে আরও অনেক আবেগঘন ব্যাখ্যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালেও সেগুলোকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

একটি হৃদয়স্পর্শী ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনার গল্প বহন করতে শুরু করে, এই ঘটনাটি তারই উদাহরণ।

তাই আবেগে শেয়ার করার আগে একটি প্রশ্ন করাই সবচেয়ে জরুরি—ভিডিওটি সত্যি, কিন্তু ভিডিওটির সঙ্গে যে গল্পটি বলা হচ্ছে, সেটাও কি সত্যি?

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ