সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

সারাবাংলা
৪:১৬ অপরাহ্ন, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মায়ের টাকা তুলতে ঘুষ, ক্ষোভে ১৭ বছরের শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’—১২ দিনে ১২ হাজার অভিযোগ

হাতে কোনো অস্ত্র নেই, নেই রাজপথে মিছিলও। প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ১৭ বছরের এক তরুণ বেছে নিয়েছেন কিবোর্ড আর একটি ওয়েবসাইট। নিজের পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘুষের অভিজ্ঞতা থেকেই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর শাহেদ শরীফ আহমেদ তৈরি করেছেন ‘ঘুষ.সাইট’। ২১ আগস্ট চালুর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনায় আসে ওয়েবসাইটটি। মাত্র ১২ দিনের মধ্যে এতে জমা পড়েছে ১২ […]

মায়ের টাকা তুলতে ঘুষ, ক্ষোভে ১৭ বছরের শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’—১২ দিনে ১২ হাজার অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

হাতে কোনো অস্ত্র নেই, নেই রাজপথে মিছিলও। প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ১৭ বছরের এক তরুণ বেছে নিয়েছেন কিবোর্ড আর একটি ওয়েবসাইট। নিজের পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘুষের অভিজ্ঞতা থেকেই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর শাহেদ শরীফ আহমেদ তৈরি করেছেন ‘ঘুষ.সাইট’।

২১ আগস্ট চালুর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনায় আসে ওয়েবসাইটটি। মাত্র ১২ দিনের মধ্যে এতে জমা পড়েছে ১২ হাজার ২০২টি অভিযোগ। ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের মোট অঙ্ক প্রায় ৩৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

তবে ওয়েবসাইটে জমা পড়া এসব তথ্যকে যাচাই করা অভিযোগ বা কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাবি করছে না উদ্যোক্তারা। বরং সাধারণ মানুষের ঘুষের অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

যে অভিজ্ঞতা বদলে দিল শাহেদের চিন্তা

শাহেদ শরীফ আহমেদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে তার নিজের পরিবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা।

২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান শাহেদের মা আমিনা খাতুন। তিনি ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।

মায়ের মৃত্যুর পর তার সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম শামীমকে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়। পরিবারের দাবি, প্রায় সাত লাখ টাকার প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল।

সব মিলিয়ে ওই অর্থ তুলতে ৩৮ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।

এরপর আরও ১০ লাখ টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। এদিকে নিজের ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়েও শাহেদ ফাইল আটকে রেখে দেড় হাজার টাকা নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

মাত্র দুই ঘণ্টায় তৈরি হলো ওয়েবসাইট

এই অভিজ্ঞতাগুলোই শাহেদের মধ্যে ঘুষের বিরুদ্ধে কিছু করার তাগিদ তৈরি করে। বিদেশে একই ধরনের একটি উদ্যোগের কথা জানার পর নিজের মতো করে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ওয়েবসাইটটির প্রাথমিক কাঠামো ও কোডিং তৈরি করতে শাহেদের সময় লাগে মাত্র দুই ঘণ্টা। পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয় এবং ২১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ‘ঘুষ.সাইট’।

পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। শাহেদ দেখছেন ওয়েবসাইটের কোডিং ও কারিগরি দিক, আর সাইফ সামলাচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও বিপণন। অভিযোগগুলো স্ক্রিনিং ও ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দেওয়ার কাজেও রয়েছে একটি মডারেশন টিম।

কোথায় কত ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সেই চিত্র তুলে ধরাই লক্ষ্য

‘ঘুষ.সাইট’-এ অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীর নাম বা পরিচয় প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। সরকারি কোন দপ্তরে, কী ধরনের সেবা নিতে গিয়ে, কোথায় এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে—এসব তথ্য জানাতে পারেন ভুক্তভোগীরা।

তবে সাইটটি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নাম, পদবি কিংবা ফোন নম্বর প্রকাশ করে না। জমা পড়া অভিযোগও সরাসরি প্রকাশ করা হয় না; মডারেশনের পর ব্যক্তিগত বা আপত্তিকর তথ্য বাদ দিয়ে সেগুলো প্রকাশ করা হয়।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, লক্ষ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করা নয়। বরং বিভিন্ন মানুষের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এনে বোঝার চেষ্টা করা—কোন সরকারি সেবা বা দপ্তর ঘিরে কত বেশি ঘুষের অভিযোগ আসছে।

১২ দিনে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ

চালুর পর থেকেই দ্রুত বাড়তে থাকে অভিযোগের সংখ্যা। প্রথম দুই দিনেই ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। তিন দিনের মাথায় তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৮৫৬টিতে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সংখ্যাটি কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়।

১২ দিনের মাথায় এসে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ হাজার ২০২-এ। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট দাবিকৃত ঘুষের অঙ্কও কয়েক শ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

এই পরিসংখ্যানই এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ আসলে কতটা ঘুষের চাপের মুখে পড়ছেন?

তবে অভিযোগগুলো এখনো ‘যাচাই করা প্রমাণ’ নয়

‘ঘুষ.সাইট’-এর তথ্য নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি। এখানে জমা পড়া প্রতিটি তথ্য মূলত ব্যবহারকারীর দেওয়া অভিযোগ। এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা ঘটনা বা আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নয়।

উদ্যোক্তারাও নিজেদের প্ল্যাটফর্মকে কোনো তদন্তকারী সংস্থা কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প হিসেবে দেখছেন না। তাদের লক্ষ্য হলো মানুষের অভিজ্ঞতাগুলোকে একটি উন্মুক্ত ডাটাবেজে তুলে ধরা, যাতে ঘুষের প্রবণতা সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়।

‘আমার ছেলে ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন’

শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে তাকে ঘুষ দিতে হয়েছে। বাকি অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তার ভাষ্য, এসব অভিজ্ঞতার প্রতিবাদ থেকেই ছেলে ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছে। তবে উদ্যোগটি আলোচনায় আসার পর ছেলে ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।

শাহেদও জানিয়েছেন, উদ্যোগটি এত দ্রুত মানুষের নজরে আসবে—শুরুতে তিনি তা ভাবেননি। তার মূল লক্ষ্য ঘুষের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে এসব তথ্য ব্যবহার করে অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট করা।

এখন নজর কর্তৃপক্ষের দিকে

মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক তরুণের ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া একটি ওয়েবসাইট যখন কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে পরিণত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে আসে পরবর্তী প্রশ্নটি।

এই অভিযোগগুলোর কতটা সত্য, কোথায় সত্যিই ঘুষ নেওয়া হয়েছে এবং কোন দপ্তর বা সেবায় অনিয়মের প্রবণতা বেশি—তা যাচাই করার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

একটি ওয়েবসাইট হয়তো নিজে কোনো দুর্নীতির বিচার করতে পারে না। কিন্তু সেখানে জমা পড়া বিপুলসংখ্যক অভিযোগ যদি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে দুর্নীতির একটি বড় চিত্র সামনে আসতে পারে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ