আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ‘যৌনাঙ্গ চুরি’ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবকে কেন্দ্র করে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গুজবের জেরে তানজানিয়া, মোজাম্বিক, জাম্বিয়া, মালাউই, কেনিয়া ও আরও কয়েকটি দেশে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট বিভিন্ন দেশের পুলিশের কাছ থেকে এসব ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই […]
ছবি: সংগৃহীত
আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ‘যৌনাঙ্গ চুরি’ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবকে কেন্দ্র করে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গুজবের জেরে তানজানিয়া, মোজাম্বিক, জাম্বিয়া, মালাউই, কেনিয়া ও আরও কয়েকটি দেশে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট বিভিন্ন দেশের পুলিশের কাছ থেকে এসব ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে।
এই গুজবের মূল দাবি হলো—অপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বা শরীরে হাত দিলে তার যৌনাঙ্গ ছোট হয়ে যেতে পারে কিংবা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্ট এসব দাবিকে আরও উসকে দিয়েছে।
তানজানিয়ার মেকানিক বনিফাস এমগালা এপ্রিলে এমনই এক হামলার শিকার হন। বিবিসিকে তিনি জানান, একদল মানুষ তাদের বিরুদ্ধে অন্যের যৌনাঙ্গ চুরির অভিযোগ তুলে হামলা চালায়। বিশাল জনতার কারণে সেখান থেকে পালানোর কোনো সুযোগও ছিল না।
হামলায় গুরুতর আহত হয়ে এমগালা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। দুই দিন পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি জানতে পারেন, তার সঙ্গে থাকা বন্ধু মারা গেছেন। এখনো তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটেন এবং কাজে ফিরতে পারেননি।
আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এ ধরনের গুজব নতুন নয়। বিশেষ করে জাদুটোনা ও অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের সঙ্গে এসব দাবির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে স্মার্টফোন, টিকটক ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এসব গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
জাম্বিয়ার তুন্দুমা এলাকায় এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ফটোগ্রাফার ও ব্যবসায়ী মাইকেল সিলাভওয়ে। তিনি জানান, সামাজিক মাধ্যমে যৌনাঙ্গ চুরির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়তে থাকে।
এক পর্যায়ে তিনি দেখতে পান, এক ব্যক্তিকে মারধর করা হচ্ছে। পরে ওই ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় বলে জানান তিনি।
বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিও যাচাই করেছে, যেটি এক লাখের বেশি মানুষ দেখেছিল। ভিডিওটিতে একদল মানুষ একজন ব্যক্তিকে মারধর করছিল এবং তার কাছে কথিত চুরি যাওয়া যৌনাঙ্গ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছিল।
এই গুজবকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে মোজাম্বিকে। দেশটির পুলিশ মে মাসে জানিয়েছিল, মাত্র ছয় সপ্তাহে পুলিশ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি চাকরিজীবীসহ ৫৫ জন নিহত হয়েছেন।
মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপো এসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যৌনাঙ্গ চুরির দাবিগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মানুষের শরীরের কোনো অংশ এভাবে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোনো চিকিৎসাগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দেশটির ক্যাবো ডেলগাদো প্রদেশে গুজব মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষকে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ওই এলাকার দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও কয়েক সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
সরকারের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রচারণায় বলা হয়েছে, এসব ঘটনার পেছনে কোরো সিন্ড্রোম নামের একটি মানসিক অবস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। এই অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করতে পারেন যে তার যৌনাঙ্গ শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে বা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কেনিয়ার কোয়ালে ও মোম্বাসা উপকূলীয় কাউন্টিতেও একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
মোম্বাসা কাউন্টির কমিশনার মোহাম্মদ নুর অভিযোগ করেছেন, কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিউ ও এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য এসব ভিত্তিহীন দাবি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ভুল তথ্য খুব সহজেই প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
পুলিশ পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে এক বাবা ও ছেলেকে এক বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
মালাউইতেও একই ধরনের গুজবকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় আটজন নিহত হয়েছেন।
লেখক জুলিয়েন বনহোম তার ‘দ্য সেক্স থিভস: দ্য অ্যানথ্রোপোলজি অব আ রিউমার’ বইয়ে যৌনাঙ্গ চুরির গুজবের বিস্তার এবং মানুষ কেন এসব দাবি বিশ্বাস করে, তা বিশ্লেষণ করেছেন।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও এসব গুজবকে আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে করাতে পারে। কারণ ভিডিওতে ঘটনাগুলোকে তাৎক্ষণিক ও বাস্তব বলে মনে হয়। ফলে যাচাই না করেই অনেকে সেগুলো অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেন।
গুজবের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে যৌনাঙ্গ চুরি থেকে রক্ষার নামে বিভিন্ন তাবিজ-কবচের প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও ও কৌতুক তৈরি করছেন।
তবে এসব গুজবের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—ভিত্তিহীন একটি অভিযোগ মুহূর্তের মধ্যে একজন নিরপরাধ মানুষকে উত্তেজিত জনতার হামলার শিকার করতে পারে।
তানজানিয়ার এমগালা শারীরিকভাবে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও বন্ধুকে হারানোর ঘটনা তাকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়।
তিনি বলেন, বন্ধুর মৃত্যু এতটা অর্থহীনভাবে ঘটেছে—এই বিষয়টি মনে পড়লে এখনো গভীর কষ্ট হয়। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই একজন মানুষকে হামলার শিকার হতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত জীবন হারাতে হবে—এটাই তার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক।