বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশগুলোতে প্রবীণদের জন্য তীব্র তাপ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বয়স্ক মানুষদের বছরে টানা প্রায় তিন মাস এমন তাপমাত্রার মধ্যে থাকতে হতে পারে, যা তাদের শরীরের জন্য […]
বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশগুলোতে প্রবীণদের জন্য তীব্র তাপ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বয়স্ক মানুষদের বছরে টানা প্রায় তিন মাস এমন তাপমাত্রার মধ্যে থাকতে হতে পারে, যা তাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও নাইজারকেও বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং যাদের বসতবাড়িতে পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা নেই, তাদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
গবেষণায় বয়সভেদে তাপ ও আর্দ্রতার প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কমে যায়। প্রবীণদের ঘাম উৎপাদন তুলনামূলক কম হওয়া, রক্তনালির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ার কারণে একই পরিবেশ তরুণদের তুলনায় তাদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মানুষ কতটা গরম ও আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে, তা নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তাপমাত্রা সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আগের অনেক গবেষণায় মূলত তরুণ ও সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নতুন গবেষণায় প্রবীণদের শারীরবৃত্তীয় সক্ষমতাকে আলাদাভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এর ফলে আগে যে তাপমাত্রাকে তুলনামূলক সহনীয় বলে ধরা হতো, প্রবীণদের ক্ষেত্রে সেটিই অনেক আগে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণার মডেল অনুযায়ী, শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বিশ্বজুড়ে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতি বছর অন্তত এক মাস এমন তাপের মুখোমুখি হতে পারেন, যা শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
উষ্ণতা আরও বাড়লে এই ঝুঁকির আওতায় আসা মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি অতিরিক্ত ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার সঙ্গে আরও প্রায় ১০০ কোটি মানুষ এমন তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারেন এবং তাদের শরীর যে মাত্রার তাপ ও আর্দ্রতা স্বাভাবিকভাবে সামলাতে পারে, তার চেয়ে বেশি চাপের মধ্যে আরও প্রায় এক মাস কাটাতে হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, ঘনবসতি এবং অনেক পরিবারের সীমিত শীতলীকরণ সুবিধা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে প্রবীণদের জন্য তাপপ্রবাহের সময় পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎ এবং ঠান্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, তাপজনিত ক্ষতির বড় অংশ ঘরের ভেতরেও ঘটতে পারে। ফলে শুধু বাইরে থাকা মানুষ নয়, বাড়িতে থাকা প্রবীণ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় অভিযোজন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
বিশেষ করে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য ঘর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাপপ্রবাহের সময় এসব জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুরক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপের সময়কাল ও তীব্রতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এটি জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করছে।
তথ্যসূত্র প্রতিবেদন: Deutsche Welle