ইয়েমেনের ছোট্ট পেরিম দ্বীপ হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থিত এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় পেরিমের কৌশলগত মূল্যও বাড়ছে। পেরিম, যা মিয়ুন নামেও পরিচিত, বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে […]
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের ছোট্ট পেরিম দ্বীপ হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থিত এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় পেরিমের কৌশলগত মূল্যও বাড়ছে।
পেরিম, যা মিয়ুন নামেও পরিচিত, বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে অবস্থিত। এই সরু জলপথ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল গুরুতরভাবে কমে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে বাব আল-মান্দাব হয়ে যাওয়া নৌপথের ওপর আন্তর্জাতিক নির্ভরতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে পেরিমের নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর হাতে। তবে দ্বীপটির আশপাশের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
বৃহস্পতিবার হুথিরা পেরিমের উত্তরে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর মোচা দখল করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পেরিম থেকে মোচার দূরত্ব প্রায় ৫০ মাইল। মোচা দখলের ফলে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকায় হুথিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, হুথিরা শেষ পর্যন্ত পেরিমের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে বাব আল-মান্দাবের জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পেরিম দ্বীপের অবস্থানই এর সবচেয়ে বড় শক্তি। বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের কাছে অবস্থিত এই দ্বীপ থেকে আরব উপদ্বীপের পাশাপাশি আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলও কাছাকাছি দেখা যায়। কিছু এলাকায় দুই ভূখণ্ডের দূরত্ব প্রায় ১০ থেকে ১২ মাইলের মতো।
এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বহু শতাব্দী ধরে পেরিমের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের সময় ভারতগামী জাহাজের কয়লা সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবেও দ্বীপটি ব্যবহৃত হয়েছে। এখনও সেখানে সেই সময়ের কিছু পুরোনো স্থাপনার চিহ্ন রয়েছে।
তবে বর্তমানে দ্বীপটির গুরুত্ব মূলত সমুদ্রপথ ও নিরাপত্তাকে ঘিরে। হুথিদের অগ্রগতি সেই গুরুত্বকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
রয়টার্সের হিসাবে, তিন বছর আগে সমুদ্রপথে পরিবহন করা বৈশ্বিক তেলের প্রায় ৭ শতাংশ বাব আল-মান্দাব দিয়ে যেত বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে এই পথ দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবু হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব রয়েছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগর ব্যবহার করে তেল পরিবহনের পরিমাণও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
হুথিদের হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই নৌপথে তেল পরিবহন আরও কমে যেতে পারে। এর প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পেরিম হুথিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে বাব আল-মান্দাবের ওপর তাদের সামরিক প্রভাব অনেকটাই বেড়ে যাবে। তখন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও সমুদ্রপথে মাইন পাতা কিংবা জাহাজ চলাচলে অন্যভাবে বাধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইয়েমেন সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক সালেহ সতর্ক করেছেন, হুথিরা পেরিম নিয়ন্ত্রণে নিলে তাদের সরাতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বাহিনী ও নৌবহরের প্রয়োজন হতে পারে। তার মতে, ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক সংকট নয়, এটি ক্রমেই ভূরাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে।
পেরিমের কাছের মোচা বন্দরও সাম্প্রতিক লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হুথিদের অগ্রগতির ফলে বন্দরটি এখন সরাসরি সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। মোচা দখলের মাধ্যমে হুথিরা বাব আল-মান্দাবের দিকে আরও এগিয়ে গেছে।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়বে। এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, আয়তনে ছোট হলেও পেরিম দ্বীপের অবস্থান এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের পাশে, যার ওপর বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। হুথিরা যদি সত্যিই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে বাব আল-মান্দাব নিয়ে বর্তমান উদ্বেগ আরও বড় আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।