রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্তে একের পর এক অসংগতি সামনে আসছে। শুরুতে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ডের যে বর্ণনা দিয়েছিল পুলিশ, অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। গত […]
ছবি: সংগৃহীত
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্তে একের পর এক অসংগতি সামনে আসছে। শুরুতে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ডের যে বর্ণনা দিয়েছিল পুলিশ, অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
গত ২৩ আগস্ট গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ১২ বছরের ছেলে প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাদের জবানবন্দির বরাতে জানানো হয়, ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলায় হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
তবে পরবর্তী তদন্ত ও বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনার বেশ কিছু জায়গায় মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ৩১ আগস্ট দুই আসামির ডোপ টেস্টে শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার রাতে কথিত ইয়াবা সেবনের স্থান, অভিযুক্তদের গতিবিধি এবং সীমান্ত নামের এক তরুণের মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে মামলার এজাহারে থাকা তথ্যের পার্থক্য রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার পথেই মাদক সেবনের সুযোগ থাকলে অভিযুক্তরা কেন পরিবারের চার সদস্যকে একে একে হত্যা করল? এতগুলো হত্যাকাণ্ডের সময় আশপাশের কেউ কোনো শব্দ শুনতে পেলেন না কেন—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রযুক্তিগত তথ্য নিয়েও অসঙ্গতির কথা বলা হচ্ছে। ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী ও অভিযুক্তদের ফোন একই টাওয়ার এলাকার মধ্যে সক্রিয় থাকলেও তারা একই স্থানে ছিলেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য আর্থিক কারণ হিসেবে গণপতি চক্রবর্তীর ১৫ লাখ টাকার প্রভিডেন্ট ফান্ডের কথা সামনে এসেছিল। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাচারী বাজারের সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই অর্থ থেকে তিনি কোনো টাকা উত্তোলন করেননি।
এ ছাড়া নথিপত্র অনুযায়ী, তিনি অবসর-পূর্ব ছুটিতে (এলপিআর) থাকায় পেনশনের অর্থ পাওয়ার বিষয়টিও তখন কার্যকর হয়নি। ফলে অর্থের লোভে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে—এমন ধারণার পক্ষেও এখন পর্যন্ত শক্ত ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহজনক কোনো মোটরসাইকেলের আনাগোনা দেখা না গেলেও বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ কীভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ফিডারে সেদিন মাত্র ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং ছিল। এর বাইরে খুঁটি থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আরটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়িতে সিসিটিভি থাকার সন্দেহে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়ার তথ্যও তদন্তে এসেছে।
স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগের দেড় মাসে গণপতি চক্রবর্তীর আচরণেও পরিবর্তন এসেছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, তিনি অজ্ঞাত কারণে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমাতেন এবং কখনো কখনো রসিকতার ছলে নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথাও বলতেন।
এদিকে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী নিহত আগামী চক্রবর্তী মৃত্যুর আগে এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনে সরকারি চাকরিপ্রার্থী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
গণপতি চক্রবর্তীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। তাঁর শেষ ইনকামিং কলটি আসে ২০ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রীর মোবাইল থেকে। ফোনটি পরদিন ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়সীমার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত দুই তরুণকে গ্রেপ্তার এবং মাদককে কেন্দ্র করে হত্যার ব্যাখ্যা দেওয়ায় শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। পরে মামলার তদন্তভার মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) দেওয়া হয়।
এখন তদন্তকারীদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসা মাদকের গল্পই কি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো পরিকল্পনা বা ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে?
তদন্তের বিভিন্ন অসংগতি, ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়া এবং ঘটনাস্থলের কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের কারণে নিহত পরিবারের স্বজনেরা নিরপেক্ষ ও গভীর পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। অপরাধটির প্রকৃত কারণ এবং সম্ভাব্য নেপথ্য পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত করাই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।