সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
২:০৮ অপরাহ্ন, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রীলঙ্কার চেম্মানিতে গণকবর, ৫৭২ জনের কঙ্কাল উদ্ধার

উত্তর শ্রীলঙ্কার জাফনা অঞ্চলের চেম্মানি এলাকায় একটি গণকবর থেকে শিশু ও নবজাতকসহ ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এটিকে শ্রীলঙ্কায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ চলার সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে শ্রমিকেরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। এরপর তদন্ত ও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। গত আগস্টে […]

শ্রীলঙ্কার চেম্মানিতে গণকবর, ৫৭২ জনের কঙ্কাল উদ্ধার

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

উত্তর শ্রীলঙ্কার জাফনা অঞ্চলের চেম্মানি এলাকায় একটি গণকবর থেকে শিশু ও নবজাতকসহ ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এটিকে শ্রীলঙ্কায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে।

চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ চলার সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে শ্রমিকেরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। এরপর তদন্ত ও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। গত আগস্টে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ হওয়ার পর মোট ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।

গৃহযুদ্ধের সময়ের মরদেহের সন্দেহ

চেম্মানিতে গণকবর থাকার কথা আগে থেকেই জানা ছিল। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে কবর দেওয়া হয়েছিল বলে আদালতে জানিয়েছিলেন গৃহযুদ্ধের সময় এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্য।

অধিকারকর্মীদের ধারণা, এসব মরদেহের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষও থাকতে পারেন। ১৯৯৮ সালে চেম্মানিতে প্রথম দফা খননে ১০টির বেশি মানব কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। তবে ওই আবিষ্কার বা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিচার হয়নি।

বর্তমানে যে গণকবরটি খনন করা হয়েছে, সেটি গৃহযুদ্ধের সময় কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলাকায় অবস্থিত ছিল।

১৯৯৬ সালে জেয়ারুবি জয়পালানের বাবা কান্দাইয়া জয়পালানকে চেম্মানির কাছে একটি সেনা চেকপয়েন্ট থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। জেয়ারুবির আশা, নতুন এই আবিষ্কারের মাধ্যমে তার বাবাসহ বহু নিখোঁজ মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ

চেম্মানি এলাকাতেই ১৮ বছর বয়সী তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল। পরে ওই মামলায় পাঁচ সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাদের মরদেহ চেম্মানি এলাকায় পাওয়া যায়।

নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো হয়েছে। অনেকের ধারণা, এখানে গৃহযুদ্ধের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে।

শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দাফনগুলো অবৈধ ছিল এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্ধার করা অনেক দেহাবশেষ কাপড়বিহীন অবস্থায়, ঘনভাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে অগভীর গর্তে পাওয়া গেছে।

তবে এখনো ডিএনএ পরীক্ষা হয়নি। ফলে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

গৃহযুদ্ধে নিখোঁজ হাজারো মানুষ

শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

গত কয়েক দশকে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন এলাকায় ২০টির বেশি গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে এর কোনোটিকেই নিশ্চিতভাবে জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি এবং এসব ঘটনায় কোনো বিচারও হয়নি। ২০১৮ সালে মান্নারে আবিষ্কৃত আরেকটি গণকবর থেকে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার হলেও তদন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

দেহাবশেষের পরিচয় শনাক্তে পরীক্ষা

চেম্মানি থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষ বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের কাছে আদালতের হেফাজতে রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তৈরি করছেন। দেহাবশেষের বয়স ও মৃত্যুর কারণ জানতে আরও পরীক্ষা চালানো হবে। প্রয়োজনে কিছু নমুনা বিদেশেও পাঠানো হতে পারে।

সরকার জানিয়েছে, তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করবে। তবে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে চেম্মানিতে কবর দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, সব অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—উদ্ধার হওয়া ৫৭২ জন কারা ছিলেন, কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া মানুষের সংখ্যা কত। এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেহাবশেষের পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ