লেবাননের সংসদে ঐতিহাসিক এক ভোটের মধ্য দিয়ে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে আরব বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়াল লেবানন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ১২৮ সদস্যের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতা বিলোপের পক্ষে ভোট দেন। তবে হিজবুল্লাহর সংসদীয় দল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। নতুন ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কঠোর […]
ছবি: সংগৃহীত
লেবাননের সংসদে ঐতিহাসিক এক ভোটের মধ্য দিয়ে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে আরব বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়াল লেবানন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ১২৮ সদস্যের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতা বিলোপের পক্ষে ভোট দেন। তবে হিজবুল্লাহর সংসদীয় দল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে।
নতুন ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কঠোর শ্রমের মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে ‘কঠোর শ্রম’ কীভাবে এবং কোন কাঠামোর অধীনে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত পরিষ্কার নয়।
লেবাননের বিচারমন্ত্রী আদেল নাসার সংসদের এই সিদ্ধান্তকে দেশের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত কিংবা পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসা মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সংসদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবাননবিষয়ক গবেষক রামজি কাইস বলেন, দেশটি এমন একটি শাস্তি ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছে, যেটিকে তিনি চরম নিষ্ঠুর হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে বিচারিক ভুল, পক্ষপাত ও স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি কখনো পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
তবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পর নতুন শাস্তি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লেবাননের আইনে ‘কঠোর শ্রম’-এর উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি খুব কমই প্রয়োগ করা হয়েছে। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট, সীমিত সম্পদ এবং কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত বন্দির চাপ এর অন্যতম কারণ।
লেবাননে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশটির সংসদে একটি বিতর্কিত সাধারণ ক্ষমা আইন নিয়েও আলোচনা চলছে। ১৯৯০ সালে ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটিকে সবচেয়ে বড় সাধারণ ক্ষমার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবটি পাস হলে কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির দণ্ডিত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে নিহত সেনা ও নিরাপত্তাকর্মীদের পরিবারের মধ্যে। ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা ও হত্যাকাণ্ডে স্বজন হারানো কয়েকটি পরিবার বলেছে, তারা অভিযুক্ত হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেখতে চায়; কম মেয়াদের কারাদণ্ড নয়।
এদিকে সংসদের ঐতিহাসিক ভোটের পর হিজবুল্লাহ তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। দেশটির বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ধর্মীয় বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাস্তবে অবশ্য লেবাননে ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর একটি অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ ছিল। এরপর আদালতগুলোতে বেশ কিছু মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও সেগুলোর অধিকাংশই কার্যকর হয়নি; পরবর্তী সময়ে সেগুলো স্থগিত বা কমিয়ে দেওয়া হয়।
নতুন সংসদীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের বাস্তব অবস্থাকেই এবার আইনি স্বীকৃতি দিল লেবানন। মৃত্যুদণ্ড বিলোপের এই পদক্ষেপ দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট