জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে আবারও রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ঘিরে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দিনের প্রথম ভাগে দেশজুড়ে ১৩৫ জনকে আটকের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ। গত […]
ছবি: সংগৃহীত
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে আবারও রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ঘিরে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দিনের প্রথম ভাগে দেশজুড়ে ১৩৫ জনকে আটকের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের পর এবার আগেভাগেই নিরাপত্তা জোরদার করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। তবে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বড় জমায়েত হয়। পুলিশের হিসাবে, শুধু রাজধানী প্যারিসেই প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে পতাকা হাতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাঁদের মুখে ‘রাষ্ট্র, পুলিশ ও ফ্যাসিস্টদের পতন হোক’ স্লোগানও শোনা যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশজুড়ে বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল এর প্রায় দ্বিগুণ।
প্যারিসের মূল মিছিলটি বেশির ভাগ সময় শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষ দিকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পুলিশের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ মুখোশধারী তরুণ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়লে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
মার্সেই শহরে তরুণেরা রাস্তায় ধাতব পাত ফেলে অবরোধ তৈরি করেন এবং আবর্জনার পাত্রে আগুন দেন। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও বোতল ছোড়ার ঘটনাও ঘটে। লিওঁসহ আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। নিস শহরেও জলকামান ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার আগের সপ্তাহের তুলনায় ১০ হাজার বেশি পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ বলেন, উগ্রপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের তৎপরতায় সহিংসতার আশঙ্কা ছিল। তাই পুলিশকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে শনিবার প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। লুভর জাদুঘর, মুসে দর্সে ও প্যারিস অপেরাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
গত সপ্তাহে দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আগেই দোকান বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছিল।
প্যারিসের বিক্ষোভ মিছিলের পথ নির্ধারণ নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। পুলিশের নির্দেশে মিছিলের পথ শহরের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে নেওয়া হয়। পুলিশের দাবি, আগের সপ্তাহে যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় ভাঙচুর হয়েছিল, সেগুলো এড়িয়ে গেলে নতুন করে সহিংসতার ঝুঁকি কমবে।
তবে বামপন্থি রাজনীতিকদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে মিছিলের পথ পরিবর্তন করে বিক্ষোভকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসের মিছিলে অংশ নেন বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। বিক্ষোভকারীদের সংযমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ফ্রান্সের চলমান সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই বিক্ষোভ সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। আগামী বছরের ১৮ এপ্রিল প্রথম দফা এবং ২ মে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গত মাসে প্যারিসের কাছের ক্রেতেই শহরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভের সূচনা হয়। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, দীর্ঘ স্কুলসময়, শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে তারা আন্দোলনে নামেন। পরে তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশের বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষও আন্দোলনের অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ একপর্যায়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই এবার দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ওর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির (আরএন) বার্ষিক সম্মেলন ঘিরেও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং ফ্রান্সের সরকারি তথ্য