যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারলে বিদেশি পরিচর্যাকর্মীরা পাঁচ বছর বসবাসের পরই দেশটিতে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি বা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর আগে তাঁদের জন্য স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল সরকার। সোমবার (২ নভেম্বর) পার্লামেন্টে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারলে বিদেশি পরিচর্যাকর্মীরা পাঁচ বছর বসবাসের পরই দেশটিতে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি বা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর আগে তাঁদের জন্য স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল সরকার।
সোমবার (২ নভেম্বর) পার্লামেন্টে নতুন অভিবাসন নীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। নতুন এই নীতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’। এর আওতায় স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে একজন অভিবাসীর আয়, পেশাগত অবদান, অভিবাসন আইন মেনে চলা এবং অন্যান্য যোগ্যতার ভিত্তিতে।
তবে পাঁচ বছরে স্থায়ী বসবাসের সুযোগটি সব অভিবাসীর জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশেষ ছাড়টি মূলত ২০২৫ সালের মে মাসের আগে যুক্তরাজ্যে আসা পরিচর্যাকর্মীদের জন্য রাখা হয়েছে। করোনা মহামারির পর দেশটির স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যা খাতে কর্মীসংকট মোকাবিলায় যাঁরা যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন, তাঁদের অবদান বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব বিদেশি পরিচর্যাকর্মী তাঁদের ভিসার সব শর্ত মেনে টানা পাঁচ বছর সামাজিক পরিচর্যা খাতে কাজ করেছেন এবং বছরে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড আয় করেছেন, তাঁরা পাঁচ বছর পূর্ণ হলে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
তবে যাঁরা এই শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য বিকল্প সুযোগ রাখা হয়েছে। তাঁরা নতুন করে আরও পাঁচ বছরের পরিচর্যাকর্মী ভিসার আবেদন করতে পারবেন। এই ভিসার ক্ষেত্রে আগের নিয়োগকর্তার সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত থাকতে হবে না। ফলে যেসব কর্মী অনিয়মকারী বা শোষণমূলক নিয়োগকর্তার অধীনে রয়েছেন, তাঁরা নতুন বৈধ নিয়োগকর্তার কাছে কাজের সুযোগ খুঁজতে পারবেন।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচর্যাকর্মী হিসেবে যুক্তরাজ্যে আসা বা এই ভিসায় পরিবর্তন করা কর্মীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পাঁচ বছরের স্থায়ী বসবাসের শর্ত পূরণ করতে পারবেন না। নতুন ভিসার মেয়াদ শেষ করে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করলে তাঁরাও স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন।
পরিচর্যাকর্মীদের জন্য বিশেষ ছাড় থাকলেও অন্যান্য অভিবাসীর ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর করা হচ্ছে। নতুন নীতিতে অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের সাধারণ অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশার কর্মীদের জন্য অপেক্ষার সময় কম রাখা হয়েছে। বছরে ৫০ হাজার ২৭১ পাউন্ডের বেশি আয় করেন এমন ব্যক্তিরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের মতো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের নির্দিষ্ট পেশাজীবীরাও পাঁচ বছরের সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে, বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করা সর্বোচ্চ করদাতারা তিন বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। তবে শুধু নির্দিষ্ট আয় থাকলেই হবে না, আবেদনকারীদের নতুন নীতির অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে।
নতুন নীতিতে স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের জন্য কয়েকটি বাধ্যতামূলক শর্ত নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে পরিষ্কার অপরাধের রেকর্ড, উচ্চ পর্যায়ের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, সরকারের কাছে কোনো বকেয়া ঋণ না থাকা এবং জাতীয় বিমা বা ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সে নিয়মিত অবদানের প্রমাণ।
অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য অপেক্ষার সময় আরও বাড়ানো হবে। এ ধরনের ব্যক্তিদের স্থায়ী বসবাসের জন্য অন্তত ২০ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। পাশাপাশি যাঁরা সরকারি ভাতা গ্রহণ করেছেন, তাঁদের আবেদনের আগে টানা পাঁচ বছর সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থাকার শর্তও রাখা হয়েছে।
শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু করার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। অনুমোদিত ও নিরাপদ পথে আসা শরণার্থীরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। তবে অনিয়মিত পথে, বিশেষ করে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষার সময় অনেক বেশি হবে।
এ ধরনের শরণার্থীদের স্থায়ী বসবাসের জন্য ২০ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাঁরা কাজ বা পড়াশোনায় যুক্ত না থাকলে সময়সীমা বেড়ে ৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথকে উৎসাহিত করা এবং অনিয়মিত পথে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করা হবে।
পরিচর্যাকর্মীদের স্থায়ী বসবাসের সময় ১৫ বছর করার প্রাথমিক প্রস্তাব নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেই সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীর বিরোধিতার পর সরকার এই কর্মীদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি নতুন সিদ্ধান্তকে সরকারের নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসা হিসেবে বর্ণনা করেছে। দলটির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলপ দাবি করেছেন, এই পরিবর্তনের ফলে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, শাবানা মাহমুদ বলেছেন, নতুন নীতির মাধ্যমে সরকারের কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে। তবে সংশোধিত পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রভাবের হিসাব পরে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যে কর্মরত বাংলাদেশি পরিচর্যাকর্মীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা ২০২৫ সালের মে মাসের আগে দেশটিতে এসেছেন, পাঁচ বছর ধরে ভিসার শর্ত মেনে সামাজিক পরিচর্যা খাতে কাজ করেছেন এবং বছরে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড আয় করেছেন, তাঁরা নতুন নিয়মে পাঁচ বছর পূর্ণ হলে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে যুক্তরাজ্যে বসবাসের পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী হওয়ার অনুমতি পাবেন না। নির্ধারিত আয়, পেশাগত কাজ, ভিসার শর্ত এবং অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসের পর যুক্তরাজ্যে আসা পরিচর্যাকর্মীদের ক্ষেত্রে এই পাঁচ বছরের বিশেষ ছাড় প্রযোজ্য হবে না; তাঁদের সাধারণ অভিবাসন নীতির নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিট অভিবাসনের মাধ্যমে দেশটির জনসংখ্যায় প্রায় ২৬ লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছেন। সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৩ লাখ থেকে ২২ লাখ মানুষ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে পারেন। এর মধ্যম হিসাব প্রায় ১৯ লাখ।
নতুন নীতির ফলে একদিকে নির্দিষ্ট পরিচর্যাকর্মীদের পাঁচ বছরের পথ বহাল থাকছে, অন্যদিকে অধিকাংশ অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় বাড়ছে। ফলে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিদেশি কর্মীদের জন্য তাঁদের ভিসার ধরন, আগমনের সময়, পেশা, আয় ও অন্যান্য যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন নিয়ম বোঝা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।