চীনে বিয়ের জন্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে গিয়ে একের পর এক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন পুরুষেরা। দীর্ঘদিনের লিঙ্গ অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা এবং বিয়ে নিয়ে সামাজিক চাপকে কাজে লাগিয়ে কিছু ঘটকালি প্রতিষ্ঠান দ্রুত বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাত্রদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের পণ হাতিয়ে নিচ্ছে। গুইঝৌ প্রদেশের গুইয়াং শহরকে ঘিরে এমন প্রতারণার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। […]
ছবি: সংগৃহীত
চীনে বিয়ের জন্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে গিয়ে একের পর এক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন পুরুষেরা। দীর্ঘদিনের লিঙ্গ অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা এবং বিয়ে নিয়ে সামাজিক চাপকে কাজে লাগিয়ে কিছু ঘটকালি প্রতিষ্ঠান দ্রুত বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাত্রদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের পণ হাতিয়ে নিচ্ছে।
গুইঝৌ প্রদেশের গুইয়াং শহরকে ঘিরে এমন প্রতারণার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় কিছু ঘটকালি সংস্থা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাত্রদের আকৃষ্ট করছে। পরে নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব প্রতারণার বেশ কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
গুইয়াংয়ের কিছু ঘটকালি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ৩০ বছরের বেশি বয়সী অবিবাহিত পুরুষদের লক্ষ্য করে দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা ও ছোট শহরের এমন পুরুষদের টার্গেট করা হচ্ছে, যাদের দীর্ঘদিন ধরে জীবনসঙ্গী খুঁজতে সমস্যা হচ্ছে। ‘ফ্ল্যাশ ম্যারেজ’ হিসেবে পরিচিত এই পদ্ধতিতে অল্প সময়ের মধ্যে পছন্দের পাত্রী দেখানো এবং বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে বিপুল অর্থ দাবি করা হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে পাত্রকে পাত্রী ও তার পরিবারের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা হয়েছে বলেও আশ্বস্ত করা হয়।
৩৭ বছর বয়সী ওয়াং ঝুয়াং এমন প্রতারণার শিকারদের একজন। তিনি জানান, পাত্রী ও তার পরিবারের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করার আশ্বাস পেয়ে একটি ঘটকালি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ ইউয়ান দেন।
বিয়ের কয়েক মাস পর তিনি জানতে পারেন, তার স্ত্রী আগে একাধিকবার বিয়ে করেছেন, তিন সন্তানের মা, বড় ধরনের ঋণে জর্জরিত এবং যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত।
পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসার পর ঘটকালি প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও আত্মগোপন করেন বলে অভিযোগ করেন ওয়াং।
আরেক ঘটনায় ৫৯ বছর বয়সী শু রুলিন তার ছেলের বিয়ের জন্য প্রায় ৫ লাখ ইউয়ান খরচ করেন। কিন্তু বিয়ের মাত্র সাত দিন পরই নববধূ নিখোঁজ হয়ে যান। পরে পুলিশ ওই নারী এবং ঘটকালি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের গ্রেপ্তার করে।
এ ধরনের প্রতারণার পেছনে শুধু ঘটকালি ব্যবসার অনিয়ম নয়, চীনের দীর্ঘদিনের জনসংখ্যাগত সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখছে।
এক সন্তান নীতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে ছেলেসন্তানের প্রতি সামাজিক পক্ষপাতের কারণে দেশটিতে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। বর্তমানে চীনে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি বেশি।
ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল ও ছোট শহরগুলোর ৩০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের একটি অংশের জন্য বিয়ে ও জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতাকেই কাজে লাগাচ্ছে কিছু অসাধু ঘটকালি প্রতিষ্ঠান।
চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ঘটকালি-সংক্রান্ত অপরাধে ১ হাজার ৫৪৬ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি দেশটির পাঁচটি সরকারি সংস্থা যৌথভাবে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করেছে।
তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতার পরও প্রতারণার অর্থ ফেরত পাওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ হচ্ছে না।
নানচিংয়ের আইনজীবী ফ্যান বিংহে জানান, এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত পাওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
কারণ প্রতারকরা অনেক ক্ষেত্রে ঘটকালির নামে চুক্তি, ফি এবং অন্যান্য লেনদেনকে বৈধ সেবার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে পরে প্রতারণার উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে ভুক্তভোগীদের নানা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
গুইয়াংয়ে প্রতারণার শিকার হওয়া অনেক পুরুষ এখন অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপের মধ্যেও রয়েছেন। কেউ কেউ শহরটিতে অবস্থান করে আইনি সমাধানের চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে অন্যদের সতর্ক করছেন।
চীনের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা দ্রুত পরিবর্তন না হলে জীবনসঙ্গী খোঁজার এই সংকটও সহজে কাটবে না। আর সেই সংকটকে কেন্দ্র করে দ্রুত বিয়ের প্রলোভন দেখানো অসাধু ঘটকালি ব্যবসা আরও বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
ফলে গুইয়াংয়ের ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি প্রতারণার মামলা নয়; এগুলো চীনের জনমিতিক সংকট কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাজারকেও প্রভাবিত করছে, তার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
সূত্র: বিবিসি