ভারতীয় লেখক, অনুবাদক ও ইতিহাসবিদ রাখশান্দা জলিল প্রতি বছর গয়ায় আয়োজিত শিল্প ও সাহিত্য উৎসবে অংশ নেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উৎসবেও তিনি যোগ দেন। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি এই আয়োজনের প্রশংসা করেন, কারণ এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মঞ্চ তৈরি করে। তবে এবারের অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল ভিন্ন। নিজের ভেতরের […]
ছবি: সংগৃহীত
ভারতীয় লেখক, অনুবাদক ও ইতিহাসবিদ রাখশান্দা জলিল প্রতি বছর গয়ায় আয়োজিত শিল্প ও সাহিত্য উৎসবে অংশ নেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উৎসবেও তিনি যোগ দেন। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি এই আয়োজনের প্রশংসা করেন, কারণ এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মঞ্চ তৈরি করে। তবে এবারের অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল ভিন্ন। নিজের ভেতরের ভয় ও উদ্বেগের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
রাখশান্দা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় দেশের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করছে, যা কালো মেঘের মতো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। এই উদ্বেগ নিয়েই তিনি উৎসবে এসেছিলেন। শুরুতে এসব কথা বলতে অস্বস্তি হলেও পরে মনে হয়েছে, ভয় নিয়ে কথা বলার জন্য এই মঞ্চই সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি বলেন, “আমি সেই ভয় নিয়ে কথা বলতে চাই, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এবং ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বকে গ্রাস করছে। ভারতের মুসলমানরা যে ভয় অনুভব করেন, তা শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—দেশের অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং এমনকি বহু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষও একই রকম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।”
তিনি জানান, এই ভয় তার মধ্যে স্থায়ী এক ধরনের হতাশায় রূপ নিয়েছে, যা হালকা জ্বরের মতো—জীবনযাত্রা থামিয়ে দেয় না, কিন্তু স্বস্তিও দেয় না। শিক্ষাদীক্ষা, সামাজিক অবস্থান কিংবা সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তিনি এই আতঙ্ক থেকে মুক্ত হতে পারেননি। এই অনিশ্চয়তা প্রতিনিয়ত তার মনকে ভারী করে তোলে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা তৈরি করে।
রাখশান্দার মতে, তিনি একা নন। ভারতের শহুরে বহু মুসলমানের মধ্যেই একই ধরনের ভয় ও নিরাশা কাজ করছে। ফলে তারা রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন এবং ক্রমশ নীরবতা বেছে নিচ্ছেন। স্কুল, কলেজ কিংবা আবাসিক এলাকার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও এই নীরবতা স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো ঘটনা নিয়ে পোস্ট করে আবার তা মুছে ফেলার প্রবণতাও এই ভয়েরই বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, সহিংসতার যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধী যদি মুসলিম হন, তাহলে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও বড় আতঙ্ক তৈরি হয়। ফলে অনেকেই নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, যেন কোনো বিতর্কে জড়াতে না হয়।
লেখকের আশঙ্কা, তার মতো তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে থাকা একজন মানুষ যদি এতটা ভীত হন, তাহলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মুসলমানদের অবস্থা কতটা শোচনীয়, তা সহজেই অনুমেয়। তাদের নেই নিরাপদ বাসস্থান, নেই সামাজিক সুরক্ষা। জীবিকার তাগিদে তারা মিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, রঙমিস্ত্রি, ছুতোর, গৃহপরিচারিকা কিংবা বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনের কাজে যুক্ত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হন, কারণ পরিচয় প্রকাশ পেলে কাজ হারানোর ভয় থাকে।
এমনকি সবজি বিক্রেতাদের কেউ কেউ নিজেদের নিরাপদ রাখতে ভ্যানে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দেন। বিরিয়ানি বা কাবাব বিক্রেতা, লেপ তৈরি কারিগর, গাড়ির মেকানিক—যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশায় আছেন—তারাও এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। লেখক প্রশ্ন তোলেন, হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় কর্মরত দরিদ্র ইমাম ও নায়েব ইমামদের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কী?
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রাখশান্দা বলেন, চেহারায় মুসলিমদের মতো না হওয়ায় তিনি অনেক সময় নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন। কিন্তু নাম প্রকাশ পেলেই পরিচয়ের বিষয়টি সামনে আসে। নামের একটি অংশ তাকে কিছু সুবিধা দিলেও অপর অংশ মুসলিম পরিচয় বহন করে। এই দ্বৈত বাস্তবতা তাকে আরও ভীত করে তোলে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি কোনো উত্তেজিত জনতা তাকে ঘিরে ধরে, তাহলে তার সব সামাজিক অবস্থান ও সুযোগ মুহূর্তেই মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে।
ভারতীয় লেখক রাখশান্দা জলিলের লেখার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ অবলম্বনে এই প্রতিবেদন।