সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

উত্তর আমেরিকা
৪:০৮ অপরাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়

যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জ্বালানি, খাবার, বিমা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বাড়তি আয়ের জন্য একাধিক কাজ করছেন। কেউ পুরোনো পোশাক বিক্রি করছেন, কেউ কম দামের খাবার বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ বাড়ি কেনার স্বপ্ন আপাতত স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত সরকারি […]

যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ মিনিটে পড়ুন |

যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জ্বালানি, খাবার, বিমা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বাড়তি আয়ের জন্য একাধিক কাজ করছেন। কেউ পুরোনো পোশাক বিক্রি করছেন, কেউ কম দামের খাবার বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ বাড়ি কেনার স্বপ্ন আপাতত স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। গত ১২ মাসে ভোক্তাপণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগস্ট পর্যন্ত আগের ১২ মাসে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পাশাপাশি পেট্রোলের মূল্যও বেড়েছে। এতে পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে।

সংসার চালাতে তিনটি কাজ করছেন স্কুলশিক্ষিকা

পশ্চিম টেনেসির একটি গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিল্পকলার শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন ৪৬ বছর বয়সী ক্যাথরিন ভন। চার সদস্যের পরিবারের ব্যয় মেটাতে মূল চাকরির পাশাপাশি তাঁকে আরও দুটি কাজ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিন তিনটি আলাদা কাজ করেন তিনি।

স্কুলের কাজ শেষ হলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা তরুণদের জন্য পরিচালিত বিকেলকালীন একটি কর্মসূচিতে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন ভন। সেখানে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকেও সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে বিকেলের শিশু পরিচর্যার খরচ ও ব্যবস্থাপনার ঝামেলা কিছুটা কমে।

তবে অতিরিক্ত কাজ করেও পরিবারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য। সংসারের আয় বাড়াতে নানা ধরনের অপ্রচলিত কাজও করছেন তিনি।

ভন বলেন, ‘টিকে থাকার জন্য আমি অবিশ্বাস্য ও পাগলাটে সব কাজ করেছি।’

তিনি স্থানীয় একটি গয়নার দোকানের জন্য হাতের মডেল হিসেবে কাজ করেছেন। বাড়িতে ১০ মিনিটের বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা জিনিসপত্র ফেসবুকের সোয়াপ গ্রুপে বিক্রি করেন। পাশাপাশি থ্রেডআপ ও পশমার্কের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পুরোনো পোশাক বিক্রি করেও বাড়তি অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন।

এ ছাড়া মৃত ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণামূলক জীবনী লেখার কাজও করেন তিনি। এত কিছুর পরও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পেট্রোলের দাম বাড়ায় বাড়ি কেনার স্বপ্ন অনিশ্চিত

ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী পুনাল ভবসার আশা করেছিলেন, ২০২৬ সাল হবে তাঁর বাড়ি কেনার জন্য অর্থ জমানোর বছর। তিনি ভেবেছিলেন, সুদের হার কমলে ঋণ নেওয়া সহজ হবে এবং নিজের বাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।

কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়ি কেনার পরিকল্পনা এখন আর বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না তাঁর কাছে।

ভবসারের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে পেট্রোলের দাম। তিনি যে গাড়ি চালান, তাতে প্রিমিয়াম মানের পেট্রোল ব্যবহার করতে হয়। তাঁর বসবাসের এলাকায় প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম প্রায় ৬ ডলার।

ভবসার বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সুদের হার কমবে এবং আমি একটি বাড়ি কিনতে পারব, কিন্তু এখন আর তা সম্ভব মনে হচ্ছে না।’

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভবসার জানান, নির্বাচনে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ।

তিনি বলেন, যে কোনো উপায়ে পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

অর্থনীতি নিয়ে বাড়ছে হতাশা

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন জরিপেও উঠে এসেছে। গ্যালাপের অর্থনৈতিক আস্থা সূচক (ইকোনমিক কনফিডেন্স ইনডেক্স) মানুষের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। সূচকটির মান মাইনাস ১০০ থেকে প্লাস ১০০-এর মধ্যে ওঠানামা করে।

সেপ্টেম্বরে এই সূচক নেমে মাইনাস ৪০-এ দাঁড়ায়। অর্থাৎ অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষের মূল্যায়নে নেতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে।

এ ছাড়া দ্য গার্ডিয়ানের গ্রীষ্মকালীন এক জরিপে অংশ নেওয়া ৯৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সংকটের মধ্যে রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে পরিবারগুলো ব্যয় কমানো, সস্তা বিকল্প খোঁজা এবং বাড়তি আয়ের পথ বের করার চেষ্টা করছে।

গরুর মাংস এখন অনেকের কাছে বিলাসিতা

যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন ক্যাটলিন গ্রিন। সাত বছর আগে সেখানে যাওয়ার সময় তাঁর মা একটি সহজ পরামর্শ দিয়েছিলেন—কম খরচে খাবার তৈরি করতে চাইলে গরুর মাংসের কিমা কিনতে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরামর্শ অনুসরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রিনের স্মৃতিতে, আগে এক পাউন্ড গরুর মাংসের কিমা পাওয়া যেত ২ ডলারে। এখন একই পরিমাণ মাংস কিনতে প্রায় ৮ ডলার খরচ হচ্ছে।

দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি ও তাঁর স্বামী এখন বিকল্প হিসেবে কিমা করা টার্কি বা মুরগির মাংস কিনছেন।

গ্রিন বলেন, ‘গরুর কিমা এখন প্রায় একটি বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। স্টেকের মতো একেবারে বিলাসিতা না হলেও, এটি কেনার আগে আমাদের এখন ভাবতে হয়।’

তাঁদের পরিবারের মাসিক গৃহস্থালি পণ্যের খরচও দ্বিগুণ হয়েছে। আগে যেখানে মাসে প্রায় ২০০ ডলার ব্যয় হতো, এখন তা বেড়ে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে।

গ্রিনের ভাষায়, ‘আমি বুঝি মূল্যস্ফীতি একটি বাস্তব বিষয়, কিন্তু আমার জীবদ্দশায় মূল্যস্ফীতি এত দ্রুত এবং এত মারাত্মকভাবে বাড়তে কখনো দেখিনি।’

দৈনন্দিন খাবারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে এখন কেনাকাটার সময় আগের চেয়ে বেশি হিসাব করতে হচ্ছে। কোন পণ্য কেনা জরুরি, কোনটি বাদ দেওয়া যায় এবং কোনটির সস্তা বিকল্প পাওয়া সম্ভব—এসব সিদ্ধান্ত এখন পারিবারিক বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

স্কুলের খরচ ও খাবার নিয়েও বাড়তি চিন্তা

টেনেসির স্কুলশিক্ষিকা ক্যাথরিন ভনের সংসারেও প্রতিনিয়ত নতুন ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। সন্তানদের স্কুলে ফেরার পর পাঁচ বছর বয়সী ছেলের স্কুলের উপকরণের জন্য ১৩০ ডলারের বিল পেয়ে তিনি বিস্মিত হন।

মুদি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খাবারের পরিকল্পনাও বদলাতে হয়েছে তাঁকে। ঘরে দুপুরের খাবার তৈরি করার তুলনায় স্কুল থেকে ছেলের খাবার কিনে দেওয়াকে এখন কম ব্যয়বহুল মনে করছেন তিনি। তাই প্রতিদিন ছেলেকে স্কুল থেকেই দুপুরের খাবার কিনে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ভনের পরিবার আরও একটি পরিকল্পনা বাতিল করেছে। এই শরতে ফ্লোরিডায় তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা থাকলেও আপাতত সেই সফর স্থগিত রাখা হয়েছে।

ভন বলেন, ‘পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন। সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক। কাজে যাওয়ার জন্য গ্যাস, বিমার খরচ বেড়েছে, দুই সন্তান ও স্বামীকে খাওয়াতে হচ্ছে। বিষয়গুলো সত্যি অনেক কষ্টের।’

মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতি বড় ইস্যু

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়িচালকদের খরচ বাড়ে না। পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যায়। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো বিশেষভাবে চাপে পড়ে।

একদিকে ক্যাথরিন ভনের মতো মানুষকে সংসার চালাতে একাধিক চাকরি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পুনাল ভবসারের মতো অনেকে বাড়ি কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। ক্যাটলিন গ্রিনের পরিবারকে আবার খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

নভেম্বরের নির্বাচনে এসব আর্থিক উদ্বেগ ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সাধারণ মানুষের কাছে জ্বালানি, খাবার, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ যে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে, তা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ