বিশ্বকে পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণের দীর্ঘ ২৮ বছরের অভিযান শেষ করে অবশেষে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন কার্ল বুশবি। সোমবার উত্তর ইংল্যান্ডে নিজের বাড়ির সামনে পৌঁছালে কান্নাভেজা চোখে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন তাঁর মা এঞ্জেলা। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এত দিন কোথায় ছিলে?’ ১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু […]
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকে পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণের দীর্ঘ ২৮ বছরের অভিযান শেষ করে অবশেষে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন কার্ল বুশবি। সোমবার উত্তর ইংল্যান্ডে নিজের বাড়ির সামনে পৌঁছালে কান্নাভেজা চোখে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন তাঁর মা এঞ্জেলা। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এত দিন কোথায় ছিলে?’
১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন সাবেক এই প্যারাট্রুপার। এরপর চার মহাদেশের ৩০টি দেশ পেরিয়ে মোট ৩১ হাজার মাইল বা প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন তিনি। পুরো যাত্রায় পায়ে হেঁটে বিশ্ব প্রদক্ষিণের অঙ্গীকার ধরে রাখতে নৌকা, বিমান কিংবা অন্য কোনো যানবাহনের সাহায্য নেননি। বরং বেরিং প্রণালির বরফ পেরিয়ে হেঁটেছেন এবং কাস্পিয়ান সাগর ও ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হয়েছেন।
তবে তাঁর এই দীর্ঘ অভিযানে নানা বাধা এসেছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ২০২০ সালের করোনা মহামারি এবং বিভিন্ন দেশের সীমান্তসংক্রান্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে একাধিকবার থমকে যায় তাঁর যাত্রা।
২৯ বছর বয়সে শুরু, ঘরে ফিরলেন ৫৭ বছরে
২৯ বছর বয়সে যাত্রা শুরু করেছিলেন বুশবি। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ৫৭ বছর বয়সে তিনি বাড়িতে ফিরলেন। সিটি হলে জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা শেষে মায়ের বাড়ির পথে হাঁটার সময় উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে কৌতুক করে তিনি বলেন, ‘দেরি করানোর জন্য দুঃখিত।’
সাংবাদিকদের বুশবি বলেন, এত দূর পৌঁছাতে পুরো বিশ্বের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছে। অচেনা মানুষের সহানুভূতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সহায়তা পেয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি একা এটি করিনি, আমার একটা বড় দল ছিল, সবচেয়ে বড় দল, আমাদের পৃথিবী।’
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাবা কিথ বুশবির পাঠানো একটি জন্মদিনের কার্ড থেকে তাঁর এই অভিযানের পরিকল্পনার সূত্রপাত। প্রথমে পাঁচ বছর এবং পরে ১২ বছরের মধ্যে যাত্রা শেষ করার ধারণা থাকলেও নানা বাধা অতিক্রম করতে শেষ পর্যন্ত ২৮ বছর লেগে যায়।
যাত্রাপথে কারাবাস, মৃত্যুর মুখোমুখি
দীর্ঘ অভিযানে একাধিক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বুশবিকে। ২০০১ সালে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বিপজ্জনক ডারিয়েন গ্যাপের জঙ্গল পেরিয়ে পানামায় প্রবেশের পর তাঁকে ১৮ দিন কারাগারে থাকতে হয়।
২০০৬ সালে বেরিং প্রণালি পার হওয়ার সময় মেরু ভালুকের মুখোমুখি হন তিনি। হিমশীতল পানিতে পড়ে প্রায় প্রাণ হারানোর পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনায় অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে রাশিয়ায় আটক হন তিনি। ভিসাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে শুধু রাশিয়া পার হতেই তাঁর প্রায় ১০ বছর সময় লেগে যায়।
১০ বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা
দীর্ঘ সফরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে দেখা হলেও মায়ের সঙ্গে এটাই ছিল ১০ বছর পর তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। গত মাসে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে দোভার সৈকতে পৌঁছানোর পর বাবা, ভাই, ৩৬ বছর বয়সী ছেলে এবং ১২ বছর বয়সী নাতনির সঙ্গে পুনর্মিলন হয় তাঁর।
মায়ের কাছে ফিরে আবেগঘন মুহূর্তেও কৌতুক করতে ভোলেননি বুশবি। মাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘নিজের যত্ন নাও মা, নিজেকে সামলাও।’
তবে জীবনের দীর্ঘতম এই অভিযান শেষ হওয়ার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বুশবির ভাষায়, ‘এটি যেন কৃষ্ণগহ্বরে পা রাখার মতো অনুভূতি। জীবনে এখন কী হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণাই নেই।’
সূত্র: এপি