স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে সহজ করেছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালেই দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এক বিপজ্জনক প্রবণতা—অনলাইন জুয়া। আগে যা নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ফলে খুব সহজেই, প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই, যে কেউ এতে জড়িয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা এখন আর কেবল শহরের উচ্চবিত্তে […]
ছবি: সংগৃহীত
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে সহজ করেছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালেই দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এক বিপজ্জনক প্রবণতা—অনলাইন জুয়া। আগে যা নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ফলে খুব সহজেই, প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই, যে কেউ এতে জড়িয়ে পড়ছে।
এই প্রবণতা এখন আর কেবল শহরের উচ্চবিত্তে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের প্রান্তিক স্তর—চায়ের দোকানদার, রিকশাচালক, শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তরুণরা, যারা প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো খুব পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়। শুরুতে ব্যবহারকারীকে ছোটখাটো জয়ের অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়, যাতে তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে সে বড় অঙ্কের ঝুঁকিতে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষতির পরও তার মনে হয়—“এবার জিতব।” এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকেই আসক্তির শুরু।
এটি কেবল ভাগ্যের খেলা নয়—এটি প্রযুক্তিনির্ভর একটি সিস্টেম, যা মানুষের মস্তিষ্ককে লক্ষ্য করে কাজ করে। জেতা বা হারার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা উত্তেজনা তৈরি করে। এই উত্তেজনা ধীরে ধীরে অভ্যাস, তারপর আসক্তিতে রূপ নেয়। একসময় এটি মানুষের চিন্তা, সময় ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন পেমেন্ট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন ঘরে বসেই যেকোনো সময় জুয়া খেলা সম্ভব। এই সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তরুণদের ক্ষেত্রে এটি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
অনলাইন জুয়ার কারণে অনেক মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। অল্প টাকা দিয়ে শুরু করলেও পরে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে পরিবারসহ চরম সংকটে পড়ছে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত নয়—পুরো পরিবার ও সমাজে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অপরাধও। টাকার লোভে চুরি, ছিনতাই এমনকি হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের অবনতি এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।
অনেক অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ব্যবহারকারীকে বারবার খেলায় ফিরিয়ে আনে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নিয়ন্ত্রিত বা ভুয়া—ব্যবহারকারী টাকা জমা দিলেও তুলতে পারে না। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু তারকা ও পাবলিক ফিগার এই প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রচারণা করছেন। এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা, এটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করছে—যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে জুয়া নিষিদ্ধ হলেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো বিদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ কঠিন। ভিপিএন ও এনক্রিপশনের কারণে এগুলো শনাক্ত করাও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ—
অনলাইন জুয়া এখন আর শুধু একটি বিনোদন নয়—এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তি যেমন সুবিধা এনে দেয়, তেমনি ভুল ব্যবহারে তা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই এখনই সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর পদক্ষেপ—এই তিনটি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে জরুরি।