সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ধর্ম
৯:৩৩ এএম, ২৬ অক্টোবর ২০২৫

ইসলামে পরিবার পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি দায়িত্ববোধ ও পরিমিতির শিক্ষা

পরিবার হলো মানুষের জীবনের এক কোমল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে নতুন প্রাণের আগমন আল্লাহর অশেষ রহমতের প্রতিফলন। এই নতুন জীবনের মাধ্যমে পরিবারে আসে এক অনন্য শান্তি, যা দুনিয়ার কোলাহলের মাঝে স্বর্গীয় প্রশান্তি বয়ে আনে। তবে আধুনিক সময়ে সন্তান সংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে—সন্তান কতো হবে, তা কি মানুষ নিজেই নির্ধারণ করবে, নাকি […]

ইসলামে পরিবার পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি দায়িত্ববোধ ও পরিমিতির শিক্ষা
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

পরিবার হলো মানুষের জীবনের এক কোমল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে নতুন প্রাণের আগমন আল্লাহর অশেষ রহমতের প্রতিফলন। এই নতুন জীবনের মাধ্যমে পরিবারে আসে এক অনন্য শান্তি, যা দুনিয়ার কোলাহলের মাঝে স্বর্গীয় প্রশান্তি বয়ে আনে। তবে আধুনিক সময়ে সন্তান সংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে—সন্তান কতো হবে, তা কি মানুষ নিজেই নির্ধারণ করবে, নাকি আল্লাহর ইচ্ছায় নির্ধারিত?

ইসলাম এই প্রশ্নের জবাবে একপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা দেয় না, বরং পরিমিতি ও দায়িত্ববোধের দৃষ্টিতে পরিবার পরিকল্পনাকে দেখে। ইসলাম সন্তাননিরোধকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে না; এটি ‘দায়িত্বপূর্ণ পরিকল্পনা’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য, যা স্বাভাবিক ও নৈতিক সীমার মধ্যে থাকতে হবে।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না; আমি তাদেরও রিজিক দিই, তোমাদেরও।” (সুরা আল-ইসরা, আয়াত ৩১)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সন্তানের জন্মকে কখনোই ভয় বা উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ, এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না। তবুও ইসলাম চিন্তাশীল ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে, যেখানে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ হিকমাহ (বুদ্ধিমত্তা) ও ন্যায়বোধের আলোকে গ্রহণ করতে হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সময় থেকে সাহাবিরা ‘আজল’ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যা হলো গর্ভধারণ বিলম্বিত করার এক পদ্ধতি। ইমাম মুসলিমের বর্ণনায় জানা যায়, রাসুল (সা.) এই পদ্ধতিকে নিষেধ করেননি, বরং এটি নৈতিক উদ্দেশ্য ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য ছিল (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৪০)।

ইমাম গাযালী বলেন, আজল বৈধ, যদি তা নৈতিক কারণ ও স্ত্রীর সম্মতির সাথে করা হয়। ইমাম ইবনু কাইয়্যিম আরও যোগ করেন, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণযোগ্য, যদি তা আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন না করে এবং মানুষের ঈমান দুর্বল না করে।

পরিবার পরিকল্পনা অর্থাৎ সন্তান সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ও সন্তানের কল্যাণ। শুধুমাত্র দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য বা বিলাসিতার জন্য সন্তান জন্ম বিলম্বিত করা ইসলামের নৈতিক বিধানের বিরুদ্ধে।

বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা ও দারিদ্র্যের চাপ অনেক সময় মানুষের মনকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের সংখ্যা নয়, সন্তানের গুণগত মানই জাতির শক্তির মাপকাঠি। পরিবার কোনো বোঝা নয়, বরং একটি দায়িত্বপূর্ণ বাগান, যেখানে প্রতিটি সন্তান ঠিকমতো লালিত হয়, যদি অভিভাবকরা মালী আর আল্লাহর নির্দেশনায় চলেন।

পরিবার পরিকল্পনা মানে জন্ম নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত আমানতের সুরক্ষা, যেখানে হিসাবের আগে আসে হৃদয়ের ঈমান ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস।
জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ও ইসলামী মতামত

জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য তিন ধরনের পদ্ধতি বিদ্যমান:

১. স্থায়ী ব্যবস্থা: যেমন ভ্যাসেকটমি (পুরুষের জন্য) এবং লাইগেশন (নারীর জন্য), যা প্রজননক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। ইসলামী দৃষ্টিতে এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এটা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তনের শামিল।

২. মেয়াদি ব্যবস্থা: যেমন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইনজেকশন, আইইউডি ব্যবহার ইত্যাদি। এই পদ্ধতি ‘মাকরুহ তাহরিমি’ হিসেবে বিবেচিত, যা হারামের কাছাকাছি। অর্থাৎ, এটি পরিহার করাই উত্তম।

৩. **সাময়িক ব্যবস্থা: যেমন কনডম বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহার। স্বাস্থ্যগত কারণে এবং অভিজ্ঞ দ্বিনদার চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে এটি গ্রহণযোগ্য। তবে যদি এর উদ্দেশ্য হয় শুধুমাত্র দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সন্তান সংখ্যা কমানো, তাহলে স্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে হলেও এটি অনুত্তম।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে জিহাদ করতেন, কিন্তু তাদের উপকরণ ছিল কম। তারা রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, তারা কি খাসি হয়ে যাবে? রাসুল (সা.) তাদের কঠোরভাবে নিষেধ করলেন এবং বলেন, আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা উচিত নয় (বুখারি, হাদিস: ৪৭০৯)।

ইসলাম ও আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা: প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব

আজকের বিশ্বের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের প্রেক্ষাপটে পরিবার পরিকল্পনা একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়। ইসলামিক শিক্ষায় এই পরিকল্পনা কেবলমাত্র সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি দায়িত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা সমাজ ও জাতির সুস্থতা রক্ষা করে।

সন্তান জন্মানো মানে শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। তাই পরিবার পরিকল্পনা মানে দায়িত্বশীল পিতামাতার চিন্তাশীল পদক্ষেপ, যা জাতির ভবিষ্যত গড়ে তোলে।

মুসলিম দম্পতিদের উচিত ইসলামী বিধান মেনে ও বিশেষজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত নেওয়া। এতে করে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হবেন এবং সমাজে সুস্থ ও সুখী পরিবার গড়ে উঠবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ