যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বেড়েছে। এসব বিজ্ঞাপনে বাস্তব রাজনীতিকদের এমন বক্তব্য দিতে বা এমন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে, যা বাস্তবে ঘটেনি। অনেক বিজ্ঞাপন দেখলেই বোঝা যায়, সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি। তবু ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করে প্রার্থীদের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বেড়েছে। এসব বিজ্ঞাপনে বাস্তব রাজনীতিকদের এমন বক্তব্য দিতে বা এমন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে, যা বাস্তবে ঘটেনি। অনেক বিজ্ঞাপন দেখলেই বোঝা যায়, সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি। তবু ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করে প্রার্থীদের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে এসব প্রচার।
নিউইয়র্কের গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানের একটি বিজ্ঞাপনে শহরটির মেয়র জোহরান মামদানি ও গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে একসঙ্গে বাগান করতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন তাঁরা বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন।
অন্য একটি বিজ্ঞাপনে হোকুলকে বলতে দেখা যায়, তিনি টোল ও যাতায়াতের ভাড়া বাড়াতে চান, যাতে মানুষ গাড়ি চালানো কিংবা পাতালরেলে যাতায়াত করার সামর্থ্য হারায়। তবে হোকুল ও মামদানি কেউই এসব বিজ্ঞাপনে অংশ নেননি। তাঁদের উপস্থিতি ও বক্তব্য এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিনীতি কেন্দ্রের পরিচালক স্কট বাবওয়া ব্রেনেনের মতে, এবারের নির্বাচনী প্রচারে এমন এআই-নির্মিত বিজ্ঞাপন বেশি দেখা যাচ্ছে, যেগুলো দেখলেই ভুয়া বলে বোঝা যায়। এ ধরনের প্রচারণাকে তিনি ‘স্লপাগান্ডা’ নামে অভিহিত করেছেন। নিম্নমানের এআই-নির্মিত উপাদান ও প্রচারণামূলক অপতথ্যের সমন্বয়ে শব্দটি তৈরি হয়েছে। ব্রেনেন সম্প্রতি প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল স্লপাগান্ডা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের সহলেখক।
ওয়েসলিয়ান মিডিয়া প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনী মৌসুমে রাজনৈতিক প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা এআই ব্যবহার করে ১৬৪টির বেশি বিজ্ঞাপন তৈরিতে ৮ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। নির্বাচনী বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী নির্দলীয় এই সংস্থার তথ্য বলছে, এসব বিজ্ঞাপনের ৮০ শতাংশের পেছনে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা।
নিজের বিজ্ঞাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ব্রুস ব্লেকম্যান বলেছেন, বিজ্ঞাপনগুলো এআই দিয়ে তৈরি—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞাপনের শুরুতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এ বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেখানো হয়। তাঁর মতে, মার্কিন রাজনীতিতে ব্যঙ্গ ও পরিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপন সেই ধারারই অংশ।
তবে ব্রেনেন মনে করেন, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য সব সময় সরাসরি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো নয়। বরং কোনো প্রার্থীর চরিত্র, আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করাও এর লক্ষ্য হতে পারে। তাঁর ভাষায়, এসব বিজ্ঞাপন ‘তথ্যগত সত্যের চেয়ে গভীরতর সত্য’ তুলে ধরার দাবি করে। কিন্তু এ ধরনের প্রচার ভোটারদের আস্থা ও রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
এআই দিয়ে তৈরি ব্যঙ্গাত্মক বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন প্রার্থীকে অস্বাভাবিক ও হাস্যকর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউনকে একটি পার্টির এমন অতিথি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি অনেকক্ষণ ধরে সেখানে রয়েছেন এবং যাঁকে আর কেউ চাইছেন না।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে ‘দ্য সাউন্ড অব মিউজিক’ চলচ্চিত্রের মারিয়া চরিত্রের মতো নীল পোশাকে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সকে উপস্থাপন করা হয়েছে সুপারহিরো হিসেবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতেও এআই ব্যবহার করে তৈরি একটি চ্যাটবট নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। শহরটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য সিনেটর স্কট উইনার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যান সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য চ্যাটবটটি চালু করেছিলেন।
চ্যাটবটটি প্রায় পাঁচ হাজার প্রশ্নের উত্তর দেয়। এতে চ্যানের বিরুদ্ধে শহরে আবাসনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যঙ্গ করা হয়। পাশাপাশি তাঁর উচ্চারণ ও নাগরিকত্ব নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। এর ফলে চ্যাটবটটির বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে।
সমালোচনার মুখে চ্যাটবটটি সরিয়ে নেন উইনার। তিনি স্বীকার করেন, উদ্যোগটি নতুনত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি ও মানবাধিকার গবেষণাকেন্দ্র স্টারলিং ল্যাবের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অ্যাডাম রোজ মনে করেন, এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত নয়।
তাঁর যুক্তি, এআই ব্যবহারের কিছু ক্ষেত্রে কেবল রং কিংবা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করা হয়। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য সব সময় সরকারি বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
তবে রোজের মতে, বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত প্রার্থীদের নিজেদেরই নিতে হয়। এসব সিদ্ধান্ত তাঁদের বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেয় এবং ভোটারদের কাছে তাঁদের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। স্কট উইনারের চ্যাটবটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ওই উদ্যোগ ভোটারদের কাছে উইনারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে একটি বার্তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই। তবে ৩১টি অঙ্গরাজ্য এ ধরনের বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ করার বিধান রেখে নিজস্ব আইন করেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ভোক্তা অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের এআই নীতি বিভাগের পরিচালক ইলানা বেলার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই অঙ্গরাজ্যগুলো আইন প্রণয়ন করছে।
তবে তাঁর মতে, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন মোকাবিলায় একটি কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রোজের অবস্থান হলো, এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপনকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করে সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, বেলার মনে করেন, বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি ভোটারদের কাছে সহজে বোধগম্য করে তুলতে হবে।
সান ফ্রান্সিসকোর কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা কনি চ্যানের মুখপাত্র ইয়ান ক্রেগার বলেন, এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তির বিকাশে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে এই প্রযুক্তির ব্যয় যেন শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। ক্রেগারের অভিযোগ, চ্যান শ্রমজীবী পরিবারগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আর উইনার এআই কোম্পানিগুলোর পক্ষে রয়েছেন।
গত বছর উইনার ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রস্তাবিত আইনটিতে অত্যন্ত বড় এআই মডেল থেকে তৈরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তাজনিত ঘটনা প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রাখার কথা ছিল। পরে তুলনামূলক শিথিল একটি সংস্করণ আইনে পরিণত হয়।
এ বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে উইনারের দপ্তর সাড়া দেয়নি।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ের কথা বিবেচনা করে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার আহ্বান জানিয়েছেন পাবলিক সিটিজেনের ইলানা বেলার।
তাঁর মতে, খাবারের মোড়কে যেমন উপাদান সম্পর্কে সহজে জানা যায়, তেমনি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের লেবেলও হতে হবে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য। এতে ভোটাররা বিজ্ঞাপনের তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে তরুণ ও বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন বেলার। তাঁর মতে, বিজ্ঞাপনে দেওয়া লেবেল খেয়াল করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
এদিকে নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক পার্টি ব্রুস ব্লেকম্যানের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন বোর্ডে অভিযোগ করেছে। দলটির দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করেছে এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। তবে ব্লেকম্যানের বক্তব্য, মানুষ এসব বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসাত্মক হিসেবে দেখছে এবং ব্যঙ্গ পছন্দ করছে।
ব্রেনেনের মতে, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়—এ বিষয়টি প্রার্থীরা জানেন। এ কারণেই এআই দিয়ে তৈরি এমন বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে। তবে কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করবেন না।
বেলারের ভাষ্য অনুযায়ী, এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের ইতিবাচক মনোভাবও দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা