নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা। গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, বাস্তুচ্যুতি এবং বসতি সম্প্রসারণের নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর বক্তব্য এসেছে অধিবেশনে। চলমান সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা। গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, বাস্তুচ্যুতি এবং বসতি সম্প্রসারণের নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর বক্তব্য এসেছে অধিবেশনে। চলমান সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে অনেক বিশ্বনেতা গাজার পরিস্থিতিকে যুদ্ধাপরাধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। তবে এসব শব্দ ব্যবহার বক্তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞেরও কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির প্রবণতা শান্তির সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করছে এবং জাতিগত নির্মূলের আশঙ্কা তৈরি করছে। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি সতর্ক করেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি গাজাকে শিশুদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় কবরস্থান এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্যে গাজায় চলমান মানবিক সংকটের ভয়াবহতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বের বিষয়টি উঠে আসে।
কাতার ও জর্ডানের নেতারাও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও গাজায় সৃষ্ট পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন। তাদের বক্তব্যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার প্রচেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়। কাতারের আমির অবিলম্বে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ এবং গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
শুধু আরব ও মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোই নয়, ইসরায়েলের কয়েকজন পশ্চিমা মিত্রও জাতিসংঘে দেশটির নীতির সমালোচনা করেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় করিডোর না খোলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বর্তমান নীতি নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে বরং আরও বড় হুমকি তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীও ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার নিন্দা জানান। তবে তিনি বলেন, ওই হামলা গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের পরবর্তী কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই বৈধতা দেয় না। অর্থাৎ হামাসের হামলার নিন্দার পাশাপাশি ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপেরও আলাদা করে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন তিনি।
ব্রাজিল, সিরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের নেতারাও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলি সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। বিভিন্ন বক্তব্যে গাজার বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ, মানবিক সহায়তার সংকট এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার বাইরেও গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। কাতার, মিশর ও জর্ডানসহ আরব ও মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন। সেখানে যুদ্ধের প্রভাব কমানো, বেসামরিক মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এদিকে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও কঠোর পদক্ষেপের আলোচনা জোরদার হয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডাসহ ১২টি পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলি বসতি এলাকা থেকে আসা পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের মধ্যে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে পৃথক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়ার আলোচনা চলার কথাও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান এই চাপ ইসরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। একদিকে ইসরায়েল হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলাকে নিজেদের সামরিক পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের নেতারা বলছেন, ওই হামলার নিন্দা করলেও পরবর্তী সময়ে গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর চালানো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বা পশ্চিম তীরে চলমান নীতির পক্ষে সেটিকে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে গাজার যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, মানবিক সহায়তা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভবিষ্যৎ—সবগুলো বিষয়ই একসঙ্গে উঠে এসেছে। ফলে জাতিসংঘের এই অধিবেশনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনার পরিধি শুধু যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে উঠেছে। আরব ও মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানেও ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা জোরালো হওয়ায় আন্তর্জাতিক চাপ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তবে যুদ্ধের অবসান, মানবিক সংকটের সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।