চাঁদের বুকে থাকা রহস্যময় একটি গহ্বরের নিচে বিশাল কোনো ভূগর্ভস্থ গুহা কিংবা লাভা টানেল রয়েছে কি না, তা সরাসরি অনুসন্ধান করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এ লক্ষ্যে নতুন একটি অনুসন্ধান প্রকল্পে সমর্থন দিয়েছে সংস্থাটি। গবেষকদের আশা, এই অভিযানের মাধ্যমে চাঁদের ভূগর্ভস্থ গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। সোমবার (৫ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির […]
ছবি: সংগৃহীত
চাঁদের বুকে থাকা রহস্যময় একটি গহ্বরের নিচে বিশাল কোনো ভূগর্ভস্থ গুহা কিংবা লাভা টানেল রয়েছে কি না, তা সরাসরি অনুসন্ধান করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এ লক্ষ্যে নতুন একটি অনুসন্ধান প্রকল্পে সমর্থন দিয়েছে সংস্থাটি। গবেষকদের আশা, এই অভিযানের মাধ্যমে চাঁদের ভূগর্ভস্থ গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য চাঁদের প্রাচীন আগ্নেয় অঞ্চলে অবস্থিত মারিয়াস হিলস পিট (এমএইচপি) নামের একটি গহ্বরের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা। গহ্বরটির নিচে কোনো বড় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা গুহা রয়েছে কি না, তা জানতে সরাসরি চাঁদের পৃষ্ঠে পরীক্ষা চালাবেন বিজ্ঞানীরা।
ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের অভিযান আরও দীর্ঘায়িত করা এবং নভোচারীদের জন্য প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে চাঁদের আগ্নেয় ইতিহাস সম্পর্কেও আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, মারিয়াস হিলস পিটের গভীরতা প্রায় ৩৪ মিটার বা ১১১ ফুট। গহ্বরটির প্রস্থ ৬৫ থেকে ৯০ মিটারের মধ্যে। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা গেলেও এটি কোনো দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা লাভা টানেলের সঙ্গে যুক্ত কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
উপগ্রহের মাধ্যমে পাওয়া ছবিতে গহ্বরটির অবস্থান ও বাইরের গঠন দেখা গেলেও এর নিচের কাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নতুন অভিযানে চাঁদের মাটির কাছাকাছি গিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা চালিয়ে এই অজানা বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করা হবে।
এ জন্য জিমলি প্রকল্পে একাধিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ব্যবহার করা হবে। এসব যন্ত্রের মধ্যে থাকবে ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করার রাডার, ভূকম্পন শনাক্তকারী সেন্সর এবং মহাকর্ষ পরিমাপের যন্ত্র। পাশাপাশি ক্যামেরার সাহায্যে চাঁদের পৃষ্ঠ ও গহ্বরের উন্মুক্ত দেয়ালের ছবি তোলা হবে।
গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডারের মাধ্যমে চাঁদের মাটির নিচে থাকা সম্ভাব্য কাঠামো শনাক্ত করা হবে। অন্যদিকে, সিসমিক সেন্সরের সাহায্যে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে শিলার বৈশিষ্ট্য ও বিভিন্ন স্তরের গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করবেন গবেষকেরা। মহাকর্ষ পরিমাপের যন্ত্রও ভূগর্ভস্থ কাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদের সক্রিয় আগ্নেয়গিরির যুগে কয়েকশ কোটি বছর আগে এসব লাভা টানেল তৈরি হয়ে থাকতে পারে। সে সময় প্রবাহিত লাভা ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর নিচের অংশ ফাঁপা থেকে যেতে পারে। এমন কোনো অক্ষত ভূগর্ভস্থ টানেল চাঁদে পাওয়া গেলে তা ভবিষ্যতে মানুষের বসবাসের উপযোগী ঘাঁটি নির্মাণে কাজে লাগতে পারে।
চাঁদের পরিবেশ মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। সেখানে তাপমাত্রার ব্যাপক ওঠানামা, ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাত এবং ক্ষতিকর সৌর ও মহাজাগতিক বিকিরণের ঝুঁকি রয়েছে। ভূগর্ভস্থ গুহা বা লাভা টানেল এসব বিপদ থেকে নভোচারীদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিতে পারে। ফলে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মানববসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনায় এ ধরনের কাঠামো বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমান্ডা হেনড্রিক্স জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে কক্ষপথ থেকে যেসব বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেগুলোর কিছু উত্তর সরাসরি চাঁদের পৃষ্ঠে নেমে অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী পুটজিগ জানিয়েছেন, অ্যাপোলো অভিযানের নভোচারীদের পর এবারই প্রথম চাঁদের মাটিতে উৎসভিত্তিক সিসমিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে চাঁদের ভূগর্ভস্থ বৈশিষ্ট্য আরও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে, মারিয়াস হিলস পিটের নিচে কী রয়েছে, তা জানার পাশাপাশি চাঁদের আগ্নেয় ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ মানববসতির সম্ভাবনা অনুসন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে এই অভিযান। তবে গহ্বরটির নিচে সত্যিই বড় কোনো গুহা বা লাভা টানেল রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে গবেষণার ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতে হবে।