জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিপ্লবীদের কয়েকজনের সরকারে যোগ দেওয়া ছিল সবচেয়ে বড় ভুল বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তার মতে, বিপ্লব সফল হওয়ার পর তাদের উচিত ছিল সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে ‘জুলাই দর্শন’ প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এ […]
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিপ্লবীদের কয়েকজনের সরকারে যোগ দেওয়া ছিল সবচেয়ে বড় ভুল বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তার মতে, বিপ্লব সফল হওয়ার পর তাদের উচিত ছিল সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে ‘জুলাই দর্শন’ প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এ ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ প্রকৌশলীদের স্মরণে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “আজকে ফ্যাসিবাদের দোসররা যে স্পর্ধা দেখাচ্ছে, তা সম্ভব হয়েছে বিপ্লবীদের ভুলের কারণে। আর প্রথম ভুল ছিল বিপ্লবীদের কয়েকজনের সরকারে যাওয়া। এই কথাটা আজ পর্যন্ত কেউ প্রকাশ্যে বলেনি। আমি আজ প্রকাশ্যে বলছি—বিপ্লবীদের কয়েকজনের সরকারে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল।”
তিনি ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলেন, কিউবার বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা ও রাউল কাস্ত্রো মিলে বিপ্লবী সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কয়েকজন বিপ্লবী বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সরকারের অংশ হয়ে গেছেন, যা তার মতে একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “আমি মনে করি, ইউনূস সাহেবের নির্বাচন শতভাগ সঠিক ছিল। তার সব কর্মকাণ্ড বা বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু ওই সময় দেশ পরিচালনার জন্য তার বিকল্প কেউ ছিল না।”
মাহমুদুর রহমান বলেন, বিপ্লবীদের সরকারে না গিয়ে বাইরে থেকে জুলাই বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করা, একটি বিপ্লবী দল গঠন করা এবং রাষ্ট্র পরিবর্তনের দর্শন প্রতিষ্ঠায় কাজ করা উচিত ছিল। তার মতে, ক্ষমতার অংশ হলে সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতার দায়ও নিতে হয়।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের শুরুতেই তিনি ‘জুলাই বিপ্লবের দর্শন’ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তবে তার মতে, বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ‘জুলাই দর্শন’ উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বলেন, “আমি শুরু থেকেই এটিকে বিপ্লব বলেছি। কারণ, এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলন।”
তিনি আরও বলেন, “বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হয় না। বিপ্লব একটি চলমান প্রক্রিয়া। আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ মনে হলেও প্রকৃত অর্থে বিপ্লব ব্যর্থ হয় না।”
জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, তাদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না এবং জাতি তাদের ভুলবে না।
বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় তার বক্তব্য নেতাদের পছন্দ না হওয়ায় পুনরায় আমন্ত্রণ পাননি। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো দলের পক্ষ বা বিপক্ষে নন; বরং জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদের পক্ষেই অবস্থান করেন।
তিনি স্মরণ করেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনার মতো একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং বিপ্লবের মাধ্যমেই সম্ভব। তার দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারণাকেই বাস্তবে প্রমাণ করেছে।
মাহমুদুর রহমান বলেন, “জুলাইয়ের বিপ্লবের কারণেই আমি দেশে ফিরতে পেরেছি, মায়ের জানাজায় অংশ নিতে পেরেছি এবং নিজ হাতে তাকে কবরে নামাতে পেরেছি।”
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিভিন্ন সংগঠন বা পরিচয়ে বিভক্ত না হয়ে সবাইকে জুলাই বিপ্লবের আদর্শের ছাতার নিচে এক থাকতে হবে।
তিনি জুলাই বিপ্লবের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, এটি ছিল একটি নিরস্ত্র বিপ্লব, একটি সম্পূর্ণ দেশীয় বিপ্লব এবং এমন একটি বিপ্লব যার কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে ভারতের সহযোগিতার কারণে ভারতীয় রাজনীতিকরা এখনো মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার দাবি করেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি শক্তি এমন দাবি করতে পারবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, “জুলাই যোদ্ধারা যখনই আমাকে ডাকে, আমি সাড়া দিই। কারণ, এই বিপ্লব ছিল আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, জীবদ্দশায় সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পেরেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি জীবনে কোনো আপস করিনি, আপস করতে জানিও না। বয়স যতই হোক, প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালী হোক, লড়াইয়ের ময়দানে আমাকে সবসময় পাশে পাবে ইনশাআল্লাহ।”
সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রকৌশলী মো. আব্দুল হামিদ। বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, প্রফেসর ড. প্রকৌশলী মাকসুদ হেলালীসহ অন্যান্য বক্তারা।