অ্যাপলের নেতৃত্বে শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আইফোন ইভেন্টে প্রথমবারের মতো নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে মঞ্চে দেখা যাবে জন টার্নাসকে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যাপলের নতুন পণ্য উন্মোচনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন টিম কুক। এবার সেই দায়িত্বে থাকছেন না তিনি। হার্ডওয়্যার প্রকৌশলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টার্নাসের ওপর তাই প্রত্যাশার […]
ছবি: সংগৃহীত
অ্যাপলের নেতৃত্বে শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আইফোন ইভেন্টে প্রথমবারের মতো নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে মঞ্চে দেখা যাবে জন টার্নাসকে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যাপলের নতুন পণ্য উন্মোচনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন টিম কুক। এবার সেই দায়িত্বে থাকছেন না তিনি।
হার্ডওয়্যার প্রকৌশলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টার্নাসের ওপর তাই প্রত্যাশার চাপও কম নয়। টিম কুকের সময়ে অ্যাপল যে বিশাল ও লাভজনক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, সেটি ধরে রাখার পাশাপাশি প্রযুক্তির পরবর্তী বড় পরিবর্তনেও নেতৃত্ব দিতে হবে তাকে।
বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের চোখে টার্নাসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নতুন জনপ্রিয় পণ্য তৈরি, বৈশ্বিক মেমোরি সংকট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রক চাপ।
অ্যাপলের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে এআই। গত দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির এআই কৌশল নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন সংস্করণের সিরি চালুর পরিকল্পনা পিছিয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে অ্যাপলের এআই প্রস্তুতি নিয়ে।
চলতি বছর নতুন সিরি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই সংস্করণে শুধু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে ব্যবহারকারীর আইফোনে থাকা টেক্সট মেসেজ, ছবি ও অন্যান্য তথ্য কাজে লাগিয়ে আরও ব্যক্তিগতভাবে উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে।
এমনকি নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপে ব্যবহারকারীর হয়ে কাজ করা এবং ফোনের পর্দায় কী দেখা যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে নতুন সিরি।
প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার জিন মুনস্টারের মতে, সিরিকে ঘিরে অ্যাপল একটি বড় সুযোগ হারিয়েছে। তবে তার ধারণা, প্রতিষ্ঠানটি এখন সঠিক পথে এগোচ্ছে।
গুগলের জেমিনির মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে অ্যাপলের এই এআই সক্ষমতা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আইডিসির জ্যেষ্ঠ পরিচালক নাবিলা পোপালের মতে, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার ওপর অ্যাপলের দীর্ঘদিনের গুরুত্ব এবং আইওএসের ক্যামেরা ও মেসেজের মতো ফিচারের সঙ্গে সরাসরি এআই যুক্ত করার সুযোগ প্রতিষ্ঠানটিকে সুবিধা দিতে পারে।
টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল শুধু আইফোনের ওপর নির্ভরশীল থাকেনি। অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস, অ্যাপল মিউজিক ও অ্যাপল কার্ডের মতো পণ্য ও সেবা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এখন আরও বড়। তারা টার্নাসের নেতৃত্বে এমন কোনো নতুন পণ্য বা প্রযুক্তি দেখতে চান, যা অ্যাপলের জন্য পরবর্তী বড় সাফল্যের দরজা খুলে দিতে পারে।
এই আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ফোল্ডেবল আইফোন।
আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ফোল্ডেবল ফোনের বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করতে পারে অ্যাপল। কিন্তু এই প্রযুক্তিতে অ্যাপল ইতোমধ্যে স্যামসাং ও চীনা নির্মাতা হুয়াওয়ের চেয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে।
ফলে টার্নাসকে শুধু বিদ্যমান পণ্যের উন্নতি নয়, নতুন ধরনের ডিভাইসের ক্ষেত্রেও অ্যাপলের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে মেমোরির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টারে এআই অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ার কারণে মেমোরির বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে প্রযুক্তি খাতেও পড়তে শুরু করেছে। অ্যাপল, নিনটেন্ডো ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান তাদের কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।
গত জুলাইয়ে অ্যাপল আইপ্যাড ও ম্যাকসহ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ালেও আইফোনের দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল। তবে টিম কুক তার সিইও হিসেবে শেষ আয়ের বিবরণী প্রকাশের সময় মেমোরির দামের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
টেকইনসাইটসের মেমোরি কভারেজ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক হাওয়ার্ডের মতে, মুনাফার হার ধরে রাখতে ভবিষ্যতে আইফোনের দাম প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ বর্তমানের ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ ডলারের আইফোনের পরিবর্তে কোনো কোনো মডেলের দাম ১ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে ক্রেতাদের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি অ্যাপলের বাজার কৌশলেও বড় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
অ্যাপলের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক নীতি। বিগ টেক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ইইউর কঠোর নজরদারি ইতোমধ্যেই অ্যাপলের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
ইইউর নিয়ম মেনে অ্যাপল অ্যাপ স্টোরের ব্যবসায়িক শর্তে পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে নতুন সিরি আইফোন ও আইপ্যাডে চালু না করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপ অ্যাপলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। তাই ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে অ্যাপলের সম্পর্ক ও নীতিগত বিরোধ সামলানো টার্নাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইউরোপীয় কমিশন অ্যাপল ও গুগলকে তাদের অপারেটিং সিস্টেমে তৃতীয় পক্ষের এআই সহকারীদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার কথা বলছে। তবে অ্যাপল ও গুগলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরাও ফোন ও কম্পিউটারে থাকা বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের সুযোগ এআই এজেন্টদের দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
জন টার্নাসের সামনে তাই শুধু নতুন আইফোন বা কোনো নতুন প্রযুক্তি উন্মোচনের চ্যালেঞ্জ নেই। তাকে একই সঙ্গে অ্যাপলের বিশাল ব্যবসার মুনাফা ধরে রাখতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে প্রযুক্তির পরবর্তী বড় পরিবর্তনের নেতৃত্বেও নিয়ে যেতে হবে।
ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষক ওয়ামসি মোহনের মতে, অ্যাপলের মতো বিশাল একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হতে পারে।
টার্নাসের আসল পরীক্ষা হবে এখানেই—টিম কুকের সময়ে গড়ে ওঠা লাভজনক ব্যবসার কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে অ্যাপলের সেই পুরোনো ‘প্রযুক্তিগত বিস্ময়’-এর অনুভূতি আবার ফিরিয়ে আনা।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের আইফোন ইভেন্ট তাই শুধু নতুন পণ্য দেখার অনুষ্ঠান নয়; এটি জন টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপলের নতুন যুগের প্রথম বড় পরীক্ষাও হতে যাচ্ছে।