দীর্ঘ এক দশক পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের ফলে মূল্যস্ফীতি, বাজারদর, বৈষম্য এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে বর্তমান আয়েই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন […]
দীর্ঘ এক দশক পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের ফলে মূল্যস্ফীতি, বাজারদর, বৈষম্য এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে বর্তমান আয়েই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর খবরে তার উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শিহাব উদ্দিন বলেন, এমনিতেই নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে, অথচ বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় একই অবস্থায় থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়। বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের বেশি হলেও বেসরকারি খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। ফলে শুধু সরকারি খাতের আয় বৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন কোনো পে-স্কেল ঘোষণা হয়নি।
২০২৫ সালে গঠিত বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করারও সুপারিশ করা হয়।
পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই নতুন বেতন কাঠামো গেজেট আকারে প্রকাশ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
তার মতে, অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে বা নতুন অর্থের সংস্থান করতে হবে। এর ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় বেতন বাড়ানো যৌক্তিক হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে বাজারে পণ্যের চাহিদাও বাড়বে। সেই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন।
তাদের মতে, কার্যকর বাজার তদারকি না থাকলে এর প্রভাব সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়বে।
সরকারি খাতের তুলনায় দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শ্রমশক্তি বেসরকারি খাতে কর্মরত। অথচ নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা মূলত সরকারি কর্মচারীরাই পাবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে আয় না বাড়লে সরকারি ও বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপও বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বেসরকারি খাতের আয় স্থবির থাকলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে বাজেট বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে সরকার যদি দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও তারল্য পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে মূল বেতন বৃদ্ধি করা হবে এবং পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে।
সরকারের আশা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতির ওপর আকস্মিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি খাতের আয় বৃদ্ধির উদ্যোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। অন্যথায় নতুন বেতন কাঠামোর সুফলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর ব্যয়বৃদ্ধির চাপও বাড়তে পারে।