নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। এখনো প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে শত শত মানুষ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাদায় ও ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদা নেমে আসার পর নেপালের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ […]
ছবি: সংগৃহীত
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। এখনো প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে শত শত মানুষ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাদায় ও ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদা নেমে আসার পর নেপালের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় এই বিপর্যয় শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে নদীগুলোর পানি বেড়ে গিয়ে গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১ হাজারের বেশি এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো নিয়ে। নেপালের ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত কয়েকশ শ্রমিক এখনো নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন কাদায় ও ধ্বংসাবশেষে ভরা সুড়ঙ্গে আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা সম্ভাব্য জীবিতদের জন্য কয়েকটি সুড়ঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ করছেন। তবে পানি, কাদা, পাথর ও ধসে পড়া অবকাঠামোর কারণে ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি সুড়ঙ্গে উদ্ধারকারী দল প্রবেশ করতে পারলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল ও চীনের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে অভিযান চলছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছেন।
বন্যায় অন্তত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি নির্মাণাধীন ছিল। প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গ ও অন্যান্য অবকাঠামোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হওয়ায় সেখানে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ এত বেশি যে অনেক জায়গায় সড়ক ও সেতুর অস্তিত্বও হারিয়ে গেছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে উদ্ধারকারী দলকে হেলিকপ্টার, খননযন্ত্র ও অস্থায়ী সেতুর সহায়তা নিতে হচ্ছে।
বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক মরদেহ অজ্ঞাত অবস্থায় রয়েছে। পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের স্বজনদের উদ্বেগও তত বাড়ছে। বিশেষ করে সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের দ্রুত উদ্ধারের জন্য পরিবারগুলো কর্তৃপক্ষের প্রতি আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অংশেও এই দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চীনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেখানে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে দুর্যোগে প্রাণহানি আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীও ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো চলছে। তবে দুর্গম ভূখণ্ড, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিপুল পরিমাণ কাদা-পাথরের কারণে নিখোঁজদের সন্ধান ও জীবিতদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলোকে।