ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের মধ্যেই দেশটির দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে সামনে এসেছে। বিপুল সরকারি ঋণ, বড় বাজেট ঘাটতি, বাড়তে থাকা সুদের খরচ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি এখন আর্থিক চাপ সামলানোর কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ফরাসি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ দেশটির গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের অন্য […]
ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের মধ্যেই দেশটির দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে সামনে এসেছে। বিপুল সরকারি ঋণ, বড় বাজেট ঘাটতি, বাড়তে থাকা সুদের খরচ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি এখন আর্থিক চাপ সামলানোর কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ফরাসি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ দেশটির গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের অন্য অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ কয়েকটি দিক থেকে একসঙ্গে বাড়ছে। সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্ডের সুদের হার বাড়ায় আগের তুলনায় ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে দেশটির বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে পেনশন ব্যয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি সরকার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, দেশটির শিক্ষার্থীরা স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। কর্মী সংকট দূর করা, গাদাগাদি শ্রেণিকক্ষের সমস্যা কমানো এবং দুর্বল স্কুল অবকাঠামো সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি ব্যয় কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ফ্রান্সে সরকারি ব্যয় কমানো বা রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ অতীতেও বড় ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। এবারও সরকারের আর্থিক সংস্কারের পরিকল্পনা সামাজিক অসন্তোষ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রিউ কেনিংহাম বলেন, ফরাসি সরকার গত সপ্তাহে বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানো এবং কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে থাকায় আইনপ্রণেতারা এসব পদক্ষেপের কিছুটা শিথিল করতে পারেন বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক শিবিরের সম্ভাব্য উত্থান ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে দেশটির সরকারি বন্ডের বাজারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফরাসি বন্ডে ব্যাপক বিক্রি হয়েছে এবং ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি উঠে গেছে। একই সময়ে ফ্রান্স ও জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হারের ব্যবধান ২০১১-১২ সালের ইউরোজোন ঋণ সংকটের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই ব্যবধানকে বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি সূচক হিসেবে দেখা হয়। জার্মানির সরকারি বন্ডকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ফরাসি ঋণের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা জার্মানির তুলনায় অতিরিক্ত যে সুদ দাবি করছেন, তা ফ্রান্সের আর্থিক অবস্থার ওপর আস্থার চাপকে প্রকাশ করছে।
বন্ড বাজারের এই অস্থিরতা শুধু ফ্রান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। ইউরোপের অন্যান্য উচ্চ ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর সরকারি বন্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ইতালিসহ কয়েকটি দেশের বন্ডের সুদের হারও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ফলে ২০১০-এর দশকের শুরুতে ইউরোপে যে সার্বভৌম ঋণ সংকট তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন কিছু বিশ্লেষক।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যাঞ্জেল তালাভেরার মতে, ফ্রান্সের অর্থনীতির আকার ও ইউরোপীয় অর্থনীতিতে এর কাঠামোগত গুরুত্বের কারণে দেশটির আর্থিক সমস্যা অন্য দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পুরো ইউরোজোনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্রান্সের আর্থিক চাপের প্রভাব মুদ্রাবাজারেও দেখা গেছে। চলতি সপ্তাহে ডলারের বিপরীতে ইউরোর দাম ১৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। ফ্রান্সের আর্থিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য অর্থনীতির অনিশ্চয়তাও ইউরোর ওপর চাপ তৈরি করছে।
ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেলেও সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি সেই প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ, ইউরোপীয় পণ্যের রপ্তানি চাহিদা এবং জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ইউরোপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনছিল। কিন্তু ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয় উভয়ই চাপে পড়তে পারে।
উচ্চ বন্ড সুদের হার সরাসরি অর্থনীতিতে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ায়। এর ফলে বাড়ি ও গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগও কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ায় বাজেটের ওপর সুদের বোঝা আরও বাড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারগুলোকে তখন ব্যয় কমানো বা কর বাড়ানোর মতো কঠিন পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
ওলন্দাজ ব্যাংক আইএনজির ম্যাক্রোইকোনমিকস প্রধান কারস্টেন ব্রজেস্কি বলেন, সরকারগুলো যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে সুদের হার আরও বাড়তে পারে। আর উচ্চ সুদের হার অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঋণ গ্রহণের ব্যয় বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্সের পাশাপাশি জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সরকারি বন্ডের সুদের হারও কয়েক বছরের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। তবে বাজারের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স, কারণ দেশটির বড় বাজেট ঘাটতি, উচ্চ সরকারি ঋণ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের ডেপুটি চিফ ইউরোজোন অর্থনীতিবিদ জ্যাক অ্যালেন-রেনল্ডস সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপের সরকারি অর্থব্যবস্থার বর্তমান দুর্বলতা ইউরোজোনের আর্থিক বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে এখনই ইউরোপজুড়ে নতুন ঋণ সংকট শুরু হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং ফ্রান্সের বন্ড বাজারে অস্থিরতা এবং দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ইউরোপের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন