সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

পরিবেশ
৩:৪৫ পিএম, ২৭ জুন ২০২৬

বর্ষার মাঝেই ফিরেছে তাপপ্রবাহ, দেশজুড়ে বেড়েছে ভ্যাপসা গরমের দুর্ভোগ

গত কয়েক দিনের তুলনায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় আবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন করে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। শনিবার দেশের আটটি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এর ফলে সারা দেশে ভ্যাপসা গরমে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বর্ষা মৌসুমে এমন পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন। শনিবার […]

বর্ষার মাঝেই ফিরেছে তাপপ্রবাহ, দেশজুড়ে বেড়েছে ভ্যাপসা গরমের দুর্ভোগ

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ মিনিটে পড়ুন |

গত কয়েক দিনের তুলনায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় আবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন করে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। শনিবার দেশের আটটি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এর ফলে সারা দেশে ভ্যাপসা গরমে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বর্ষা মৌসুমে এমন পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন।

শনিবার সন্ধ্যায় সহকারী আবহাওয়াবিদ গুলজার হোসেন জানান, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ প্রবাহিত হয়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী কয়েক দিনে ভ্যাপসা গরম আরও বাড়তে পারে, যদিও জুলাই মাসের শুরুতে বৃষ্টিপাত কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বর্ষাকালে তাপপ্রবাহের উপস্থিতিকে ব্যতিক্রমী উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং এর ফলেই প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।

এদিকে শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কম ছিল। দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় কুড়িগ্রামের রাজারহাটে, যেখানে ৫২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে রাজধানী ঢাকায় কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৫১টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১০টিতে বৃষ্টির রেকর্ড পাওয়া গেছে এবং সেসব এলাকাতেও বৃষ্টির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। ফলে দেশের প্রায় সর্বত্র তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে ভ্যাপসা গরমের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাধারণত দেশের একাধিক জেলায় তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে আবহাওয়া অধিদপ্তর মৃদু তাপপ্রবাহ ঘোষণা করে থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগের কয়েক দিনের তুলনায় দেশের প্রায় সব অঞ্চলের তাপমাত্রাই বেড়েছে। শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহীতে, যেখানে পারদ উঠেছিল ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আগের দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকাতেও তাপমাত্রা বেড়ে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষা দ্বিতীয় ঋতু এবং বর্তমানে আষাঢ় মাসের ১৪তম দিন চলছে। জুন মাসের শেষ ভাগে সাধারণত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। বরং ভর বর্ষাতেও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরাও।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক জলবায়ু ফোরামের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং বেশি তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সাধারণত জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। তবে চলতি বছরে এই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। এছাড়া জুলাই মাসেও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এ বছর এল নিনো সক্রিয় থাকায় এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হবে। তার মতে, বর্ষাকালে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আনে। বর্তমানে জুন থেকে আগস্ট সময়কালে এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে।

এল নিনোর সরাসরি প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খরাপ্রবণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনো সক্রিয় থাকা বছরগুলোতে বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে। বৃষ্টির অভাবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমেও তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব কৃষি খাতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আমন ধানের চারা রোপণ এবং সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টির প্রয়োজন হয়। বৃষ্টির ঘাটতি এবং তাপপ্রবাহের কারণে মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে, যা ফসলের উৎপাদন ও ফলনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় জলবায়ু ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে এবং বিভিন্ন জলাধারে পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন।

এদিকে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশও বর্তমানে তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের প্রায় ৮৫০টি বড় শহরের অর্ধেকের কাছাকাছি অঞ্চল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপীয় চাপ বা ‘হিট স্ট্রেস’-এর মধ্যে রয়েছে।

সেখানে তীব্র গরমের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং গরমজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে বৈশ্বিক মাত্রায় বিস্তৃত হচ্ছে, ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কতা’ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমের এই পরিবর্তিত চিত্র কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ