সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

বাংলাদেশ
৪:২০ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধস, ৬২ কেন্দ্রে ব্যাহত উৎপাদনে তীব্র লোডশেডিং

তীব্র গ্যাস-সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর ফলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৬২টি […]

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধস, ৬২ কেন্দ্রে ব্যাহত উৎপাদনে তীব্র লোডশেডিং

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

তীব্র গ্যাস-সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর ফলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ ছিল। আর বাকি ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় চলেছে।

ফলে ওই দিন দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছে। এর আগে ১০ আগস্ট চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়েছিল।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। ওই সময়ে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ জ্বালানি সংকটের কারণে কাজে লাগানো যায়নি।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে এর একটি বড় অংশ শিল্পকারখানায় দেওয়া হচ্ছে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা গ্যাস সংকটে ঢাকার বাইরে পল্লি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই লোডশেডিং চলছিল। তবে ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানীতেও লোডশেডিং শুরু হয়। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিটি এলাকায় দৈনিক এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা করলেও গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক এলাকায় এর চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

রাতে যেমন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, তেমনি দিনের ব্যস্ত সময়েও একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এতে রাজধানীর বহুতল ভবনে লিফটে আটকে পড়ার আশঙ্কার পাশাপাশি বাসাবাড়িতে পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও সংকট

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম।

কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে ভারতের আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনও কমেছে। কেন্দ্রটি দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করতে পারছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে উচ্চব্যয়ের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও ২৪টি কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহ ঘাটতি ছিল।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, পিডিবির বকেয়া পরিশোধ এবং সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে চলমান বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।

গ্যাস সরবরাহেও বড় ঘাটতি

বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট।

মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনা ঘটার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দেয়। টার্মিনালটি আবার সচল হলেও নিয়মিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

গ্যাসের এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বাসাবাড়ির রান্না ও শিল্পকারখানার উৎপাদনেও।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন। তার মতে, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজ ব্যবহার এবং অনভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভরতার মতো বিষয়গুলো সংকট আরও বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ এবং দুর্নীতি দূর করা না গেলে এই সংকট থেকে সাধারণ মানুষের দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

সব মিলিয়ে, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত থাকা এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের ব্যবধান না কমলে সামনে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ