ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র-যুব আন্দোলন এখন শুধু একটি স্থানীয় প্রতিবাদ নয়, বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনামলে রাজধানী নয়াদিল্লিতে যে ব্যাপক জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বের একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বলছে, প্রতিবেশী […]
ছবি: সংগৃহীত
ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র-যুব আন্দোলন এখন শুধু একটি স্থানীয় প্রতিবাদ নয়, বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনামলে রাজধানী নয়াদিল্লিতে যে ব্যাপক জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বলছে, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের নজির থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় তরুণদের ক্ষোভের গভীরতা বিজেপি সরকার যথাযথভাবে বুঝতে পারেনি। ফলে দিল্লির রাজপথে এখন যে আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, তা শাসকদলের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার ও মঙ্গলবার ধরে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এবং সংসদ ভবনমুখী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও দমন-পীড়নের পরও বিক্ষোভ থামেনি। বরং রাজপথে রক্তাক্ত সংঘর্ষের মধ্যেও অবস্থান ধরে রেখেছেন ক্ষুব্ধ ছাত্র-তরুণরা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই আন্দোলনকে মোদি সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করছে।
মার্কিন দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের বিশ্লেষণে জানিয়েছে, পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই কেলেঙ্কারি ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পত্রিকাটি লিখেছে, বাংলাদেশ ও নেপালে ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের ঘটনাগুলো ঘটার পরও বিজেপি ভারতের তরুণদের ক্ষোভকে হালকাভাবে নিয়েছে—বর্তমান আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা সেটাই স্পষ্ট করে।
অন্যদিকে বিবিসি তাদের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, কীভাবে ব্যারিকেড ভেঙে এগোনো তরুণদের ওপর পুলিশ নির্মমভাবে চড়াও হয়। ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায়, লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। বিবিসির প্রতিনিধি আজাদে মোশিরি জানান, ব্যঙ্গাত্মক দল হিসেবে শুরু হলেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন আর রসিকতার বিষয় নয়; এটি ভারতীয় তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের একটি প্রতিরোধমঞ্চে পরিণত হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাও ফটোফিচার ও প্রতিবেদনে পুলিশের কঠোরতা তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাঠি হাতে পুলিশ ও সিভিল পোশাকের লোকজন অসহায় তরুণদের আঘাত করছে। আল জাজিরার মতে, গত মাসে সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার ঘটনাও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে এবং এটি মোদি সরকারের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে।
মার্কিন টিভি চ্যানেল এনবিসি এই আন্দোলনকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের ‘জেন-জি অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, ভারতের বাহ্যিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঝকঝকে পরিসংখ্যানের আড়ালে কোটি কোটি শিক্ষিত তরুণের জন্য কর্মসংস্থানের সংকটই এই অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, গত ১৮ জুলাই প্রবীণ পরিবেশকর্মী ও সমাজসংস্কারক সোনম ওয়াংচুককে দিল্লির যন্তর মন্তরের অনশনস্থল থেকে পুলিশ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার পরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ওয়াংচুকের অনশন ভেঙে দেওয়ার ঘটনাকে অনেক তরুণ গভীর অপমান হিসেবে দেখছেন। সেই ক্ষোভই ২১ জুলাই সকাল থেকে দিল্লিমুখী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
বর্তমানে এই আন্দোলনের দাবি শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মোদি সরকারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে এটি এখন সার্বিক রাজনৈতিক জবাবদিহিতার একদফা দাবিতে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ভারতে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ, সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং যে কোনো আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমনের যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল, দিল্লির রাজপথে তরুণদের প্রতিবাদ সেটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তবে আন্দোলনকারীরা জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই প্রতিবাদ থামবে না। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দিল্লির এই উত্তপ্ত রাজপথ ভারতের রাজনীতিতে নতুন ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।